শনিবারের সীমালঙ্ঘন ও ছলনার পরিণতি
তূর পর্বতের অঙ্গীকারের পর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বনী ইসরাইলের আরেকটি ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেন — একটি গোষ্ঠী শনিবারের বিধান লঙ্ঘন করেছিল, আর তাদের বানরে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। এই ঘটনার শিক্ষা সরাসরি আমাদের নিজেদের জীবনে এসে পড়ে: হারামকে হালালের চেহারা দেওয়ার ভয়ঙ্কর বিপদ।
وَلَقَدْ عَلِمْتُمُ الَّذِينَ اعْتَدَوْا مِنكُمْ فِي السَّبْتِ فَقُلْنَا لَهُمْ كُونُوا قِرَدَةً خَاسِئِينَ — সূরা আল-বাকারা, ২:৬৫
Wa laqad ʿalimtumu’lladhīna’ʿtadaw minkum fi’s-sabti fa-qulnā lahum kūnū qiradatan khāsiʾīn
“আর তোমরা অবশ্যই তাদের কথা জানো, তোমাদের মধ্যে যারা শনিবারের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করেছিল; তখন আমি তাদের বললাম, ‘তোমরা ঘৃণিত বানর হয়ে যাও।'”
আয়াতের শব্দে শব্দে
‘ওয়া লাকাদ আলিমতুম’ — আর তোমরা অবশ্যই জানো (‘আলিমা’ অর্থ জানা)। ‘আল্লাজিনাতাদাও মিনকুম’ — তোমাদের মধ্যে যারা সীমালঙ্ঘন করেছিল (‘ইতাদা’ অর্থ সীমালঙ্ঘন করা, ‘মিনকুম’ অর্থ তোমাদের মধ্যে)। ‘ফিস-সাবত’ — শনিবারের ব্যাপারে (‘সাবত’ অর্থ শনিবার)। ‘ফাকুলনা লাহুম’ — তখন আমি তাদের বললাম। ‘কুনু কিরাদাতান খাসিঈন’ — তোমরা ঘৃণিত বানর হয়ে যাও; ‘কিরাদাহ’ অর্থ বানর, আর ‘খাসিঈ’ অর্থ ঘৃণিত, লাঞ্ছিত, অপদস্থ — যাকে সবাই ঘৃণা করে তাড়িয়ে দেয়। প্রচলিত অনুবাদ ‘ঘৃণিত’; ‘ইতর’ শব্দটিও এখানে যথার্থ, কারণ এর মধ্যে নীচ, ঘৃণিত, লাঞ্ছিত — সবই এসে যায়।
শনিবারের সীমালঙ্ঘনের কারণে বনী ইসরাইলের একটি গোষ্ঠীকে আল্লাহ বানরে রূপান্তরিত করে দিলেন — এক কঠিন শাস্তি। আরবিতে একে বলা হয় ‘মাসখ’ (مسخ), অর্থাৎ চেহারা বা আকৃতি বিকৃত করে দেওয়া। বর্ণিত আছে, তাদের একদলকে বানর ও আরেক দলকে শূকরে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই — একই ধরনের অপরাধ আমরাও করি; আল্লাহ যেন আমাদের হেফাজত করেন ও ক্ষমা করেন, কেননা আমাদের কাজের দিকে তাকালে এই শাস্তি আমাদের থেকেও দূরে নয়।
শনিবার কীভাবে ইবাদতের দিন হলো
শনিবার ছিল ইহুদিদের ইবাদতের দিন। বর্ণিত পটভূমি অনুযায়ী, সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন জুমার দিন (শুক্রবার), আর মূসা আলাইহিস সালাম তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন জুমাকে বিশেষ দিন হিসেবে গ্রহণ করতে। কিন্তু তারা নিজেদের যুক্তি খাটিয়ে শনিবারকে বেছে নিতে চাইল, ফলে শনিবারই তাদের ওপর নির্ধারিত করে দেওয়া হলো। কুরআনেও এর ইঙ্গিত রয়েছে:
إِنَّمَا جُعِلَ السَّبْتُ عَلَى الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ — সূরা আন-নাহল, ১৬:১২৪
Innamā juʿila’s-sabtu ʿala’lladhīna’khtalafū fīh
“শনিবার তো কেবল তাদের ওপরই নির্ধারিত করা হয়েছিল, যারা এর ব্যাপারে মতভেদ করেছিল।”
কঠোর বিধানের প্রজ্ঞা
তাওরাতের অনেক বিধান ছিল কঠোর। কেন? কারণ সেই প্রজন্ম বারবার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়েছিল, আর কঠোরতা ছিল তাদের সেই অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। বিষয়টি একটি সাধারণ নীতির আলোকে বোঝা যায়: যে অপরাধী কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায়ও অনুশোচনাহীনভাবে আবার অপকর্ম করে বসে, তাকে কারাগারের ভেতরেও অতিরিক্ত বেড়ি পরিয়ে রাখতে হয় — নতুবা সে হয়তো আরেকজনের ক্ষতি করে ফেলবে। এমন কঠিন-হৃদয় অবস্থার জন্য কঠোর ব্যবস্থাই উপযুক্ত। মানুষ ও পরিস্থিতির ভেতরের বাস্তবতা আমরা অনেক সময় জানি না বলেই প্রশ্ন তুলি — ‘এত কঠোর বিধান কেন’, কিংবা দৈনন্দিন জীবনে ‘এই কঠিন বিপদটাই বা কেন এল’। অথচ হয়তো কোনো কঠিন-হৃদয় মানুষের জন্য সেই ধাক্কাটাই প্রয়োজন, যা আমরা বুঝতে পারি না।
আদেশ-নিষেধের সাথে আসে পরীক্ষা
আল্লাহ যখন কোনো কিছু আদেশ বা নিষেধ করেন, তখন তার সঙ্গে আসে পরীক্ষা — এটি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা উচিত। অনেকে এ নিয়ে আফসোস করে। কেউ ভাবে, দাড়ি রাখার কারণে সে চাকরি পাচ্ছে না, সৎভাবে চলতে চাওয়ায় জীবিকা কঠিন হয়ে পড়ছে — অথচ সে বুঝতে পারছে না, এই মুহূর্তটাই তার পরীক্ষা। আল্লাহ সুদ নিষেধ করেছেন; কেউ বলে, ‘ঠিক আছে, কিন্তু সুদি প্রতিষ্ঠানে চাকরি না নিলে আমি খাব কী?’ — এটাই তার পরীক্ষা, কারণ আল্লাহ এই নিষেধ দিয়েই তাকে পরীক্ষা করছেন। পর্দার আদেশ এলে পর্দার সঙ্গে পরীক্ষা আসবে; পর্দার জন্য কটু কথা শোনা, দাড়ির জন্য চাকরি না হওয়া, সুদ থেকে বাঁচতে চাইলে অনেক দরজা বন্ধ থাকা — এসবই স্বাভাবিক, কারণ এখানেই আল্লাহ পরীক্ষা নিচ্ছেন। এমনকি দ্বীনদার পাত্র-পাত্রীর অপেক্ষায় বিয়ে আটকে থাকা, পরিবারের অসন্তুষ্টি — এগুলোও পরীক্ষারই অংশ।
এই পরীক্ষায় হেরে গিয়ে অনেকে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে আপসকে জায়েজ বানিয়ে ফেলে — যেমন সেই জাতি ঘুরিয়ে নিজেদের কাজকে জায়েজ বানিয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত সমাধান হলো আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করা, ধৈর্য ধরা এবং আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখা। এটি সাময়িক পরীক্ষা; দুনিয়াবি লাভের জন্য দ্বীনের সঙ্গে আপস করাই ব্যর্থতা।
সাগরতীরের জাতির পরীক্ষা
সাগরতীরে বসবাসকারী এই জাতির জীবিকা ছিল মাছ ধরা। আল্লাহ তাদের এমনভাবে পরীক্ষা করলেন যে শনিবারে — যেদিন কাজ ও মাছ ধরা নিষিদ্ধ — মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে ভেসে উঠত, আর অন্য দিনগুলোতে মাছ দেখা যেত না। এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে সূরা আল-আরাফে; সূরা আল-বাকারায় কেবল ইশারা করা হয়েছে।
وَاسْأَلْهُمْ عَنِ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَتْ حَاضِرَةَ الْبَحْرِ إِذْ يَعْدُونَ فِي السَّبْتِ إِذْ تَأْتِيهِمْ حِيتَانُهُمْ يَوْمَ سَبْتِهِمْ شُرَّعًا وَيَوْمَ لَا يَسْبِتُونَ لَا تَأْتِيهِمْ ۚ كَذَٰلِكَ نَبْلُوهُم بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ — সূরা আল-আরাফ, ৭:১৬৩
Wa’s-alhum ʿani’l-qaryati’llatī kānat hādirata’l-bahri idh yaʿdūna fi’s-sabti idh taʾtīhim hītānuhum yawma sabtihim shurraʿan wa yawma lā yasbitūna lā taʾtīhim. Kadhālika nablūhum bimā kānū yafsuqūn
“আর তাদের জিজ্ঞেস করো সেই জনপদ সম্পর্কে, যা ছিল সাগরের তীরে — যখন তারা শনিবারের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করত; যখন তাদের মাছগুলো শনিবারে ঝাঁকে ঝাঁকে ভেসে আসত, আর যেদিন তারা শনিবার পালন করত না সেদিন আসত না। এভাবেই আমি তাদের পরীক্ষা করেছিলাম, কারণ তারা সীমালঙ্ঘন করত।”
এই পরীক্ষার পেছনে একটি প্রজ্ঞা ছিল। তারা যেহেতু অবাধ্যতায় অটল ছিল, তাদের সেই অবাধ্যতা প্রকাশ পাওয়া দরকার ছিল — কারণ অবাধ্যতা প্রকাশ না পেলে শাস্তি আসে না। পরীক্ষা তাদের ভেতরের আসল অবস্থাকে বের করে আনল। এটি আমাদের জন্যও আয়না: অনেকে অন্তরে বিভ্রান্তি বা পথভ্রষ্টতা পুষে রেখে বাইরে ভালো সেজে থাকে, কিন্তু আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিতে পারেন।
ছলচাতুরিতে হারামকে হালাল
এরপর তারা একটি কৌশল বের করল। এ প্রসঙ্গের বিস্তারিত বিবরণ তাফসীরে ইসরাইলিয়াত হিসেবে এসেছে — এ ধরনের বর্ণনা উল্লেখ করা জায়েজ, তবে প্রমাণ ছাড়া তা নিশ্চিতভাবে সত্য বা মিথ্যা বলা যায় না, আর কুরআন-হাদিসের বিরোধী হলে তা প্রত্যাখ্যাত; এগুলো থেকে কেবল একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায়।
প্রথমে দু-একজন এই কৌশল করল। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, তারা শনিবারে বড়শি বা সুতা দিয়ে মাছ বেঁধে পানিতেই রেখে দিত, আর রোববারে গিয়ে তুলত — বলত, ‘আমি তো শনিবারে মাছ পানি থেকে তুলিনি।’ অন্য বর্ণনায় এসেছে, তারা সমুদ্র থেকে একটি খাল কেটেছিল; জোয়ারে পানির সঙ্গে মাছ খালে ঢুকত, আর ভাটায় পানি সরে গেলে মাছ আটকা পড়ত; শনিবারে তারা কেবল খালটা খুলে রাখত, আর রোববারে মাছ সংগ্রহ করত। উভয় ক্ষেত্রেই তারা কৌশলে হারাম কাজটাই করল, অথচ তাকে হালালের চেহারা দিল। প্রথমে দু-একজন, তারপর মাছভাজার গন্ধে খোঁজ নিয়ে বাকিরাও একই কৌশল ধরল — ‘তোমরা তো নিষিদ্ধ!’ — ‘আমরা তো শনিবারে ধরিনি, রোববারে ধরেছি’ — ‘বেশ, আমরাও করব।’ ধীরে ধীরে সবাই করতে লাগল, প্রকাশ্যে বাজারে মাছ বিক্রি শুরু হলো।
এখানেই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয়টি — ছলচাতুরির মাধ্যমে হারামকে হালালের চেহারা দেওয়া। আর এই প্রবণতা থেকে আমরা মুসলিমরাও মুক্ত নই; একই ধরনের কৌশল আমাদের মধ্যেও চলে।
তিন দল ও পরিণতি
সূরা আল-আরাফের বিস্তারিত বিবরণে দেখা যায়, সেই জনপদের মানুষ তিন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। এক দল এই অপকর্মে বাধা দিয়েছিল — ‘এটা করো না, এটা নিষিদ্ধ।’ আরেক দল নিজেরাই এই কাজ করত। তৃতীয় একটি দল ছিল নিষ্ক্রিয় — তারা নিজে করত না, কিন্তু বাধাও দিত না; বলত, ‘নিষেধ করে লাভ কী?’ — ঠিক যেমন আজও অনেকে বলে, ‘ওয়াজ করে লাভ নেই।’ যখন সীমালঙ্ঘনকারীরা নির্লজ্জভাবে এই কাজ চালিয়ে যেতে থাকল, তখন আল্লাহ বললেন, ‘তোমরা ঘৃণিত বানর হয়ে যাও।’ এক সকালে দেখা গেল, এই মানুষগুলো বানরে পরিণত হয়েছে। এখান থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাধা দেওয়ার গুরুত্ব স্পষ্ট হয় — নীরব দর্শক থাকা নিরপেক্ষতা নয়।
বানরে রূপান্তর: একটি ভুল ধারণার নিরসন
এখানে একটি ভুল ধারণার নিরসন প্রয়োজন। শনিবারের সীমালঙ্ঘনকারীদের বানরে রূপান্তর কোনোভাবেই বানর প্রজাতির উৎপত্তি নয়। আল্লাহ বানরকে অনেক আগেই বানর হিসেবে আলাদাভাবে সৃষ্টি করেছেন, আর মানুষকে মানুষ হিসেবে। এই আয়াত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ওপর শাস্তিস্বরূপ আল্লাহর রূপান্তরের (মাসখ) কথা বলছে; বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী রূপান্তরিত এই মানুষগুলো বেঁচে থাকেনি বা বংশবিস্তার করেনি। কাজেই এদের থেকে বানরের বংশ শুরু হয়েছে — এমন ভাবার কোনো কারণ নেই; আয়াতটি বংশগত উৎপত্তির কোনো দাবিই করে না।
শিক্ষা
শনিবারের এই ঘটনা প্রতিটি মুমিনের সামনে ধরা একটি আয়না। এর মূল বিপদ কেবল এই নয় যে একটি জাতি নিষিদ্ধ দিনে মাছ ধরেছিল, বরং তারা ছলচাতুরির মাধ্যমে হারামকে হালালের পোশাক পরিয়েছিল — যে প্রবণতা প্রতিটি যুগের, আমাদেরও। এটি সতর্ক করে যে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পরীক্ষায় মোড়ানো থাকে; পদ্ধতি বদলে হারাম হালাল হয়ে যায় না; নীরব দর্শকও নির্দোষ নয়; আর আত্মপ্রবঞ্চনামূলক, একগুঁয়ে অবাধ্যতার পরিণতি লাঞ্ছনা। এর শিক্ষা কোনো অতীত জাতিকে ছোট করা নয়, বরং নিজেদের কৌশল ও নিজেদের পরীক্ষাকে যাচাই করা।