সূরা আল-বাকারা ২ঃ৫১ — চল্লিশ রাতের ওয়াদা ও বাছুরের জুলুম

নিয়ামতের বর্ণনার এই ধারায় ২ঃ৫১ আয়াতটি একটি অনুগ্রহ ও একটি গুরুতর অপরাধকে পাশাপাশি রাখে। একদিকে আল্লাহ মুসা আলাইহিস সালামের সাথে তুর পাহাড়ে চল্লিশ রাতের অধিবেশন নির্ধারণ করলেন — যেখানে তাওরাত তথা শরীয়ত দান করা হবে, যা নিজেই এক বিরাট নিয়ামত; অন্যদিকে মুসা আলাইহিস সালামের সেই অনুপস্থিতিতেই বনু ইসরাইল স্বর্ণের বাছুরকে উপাস্য বানিয়ে ফেলল। আয়াতটি তাই একই সাথে অনুগ্রহের স্মারক ও সীমালঙ্ঘনের অভিযোগ।

وَإِذْ وَاعَدْنَا مُوسَىٰ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً ثُمَّ اتَّخَذْتُمُ الْعِجْلَ مِن بَعْدِهِ وَأَنتُمْ ظَالِمُونَ

Wa idh wāʿadnā Mūsā arbaʿīna laylatan thumma-ttakhadhtumu-l-ʿijla min baʿdihi wa antum zālimūn

“আর (স্মরণ করো) যখন আমি মুসার সাথে চল্লিশ রাতের ওয়াদা করলাম, অতঃপর তার (অনুপস্থিতির) পর তোমরা বাছুরকে (উপাস্যরূপে) গ্রহণ করলে, আর তোমরা ছিলে জালিম।”

চল্লিশ রাতের ওয়াদা ও বাছুর গ্রহণ

“ওয়াদনা মুসা” — আমি মুসার সাথে ওয়াদা করলাম, “আরবাইনা লাইলা” — চল্লিশ রাতের। আরবরা চল্লিশ দিনকে চল্লিশ রাত বলে; এখানে “রাত” মানে কেবল রাতের বেলা নয়, দিন-রাত মিলিয়ে পূর্ণ চল্লিশ দিবস। এই সময়টি ছিল তুর পাহাড়ে তাওরাত গ্রহণের অধিবেশন — শরীয়তপ্রাপ্তি নিজেই আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিরাট নিয়ামত।

“সুম্মা ইত্তাখাজতুমুল ইজল” — অতঃপর তোমরা বাছুরকে গ্রহণ করলে। এখানে “ইত্তাখাজা” অর্থ গ্রহণ করা বা বানানো; আর একটি শব্দ — “ইলাহ” (উপাস্য) — উহ্য রয়েছে, যা মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন: তোমরা বাছুরকে উপাস্য বানিয়ে ফেললে। “মিন বাদিহি” — অর্থাৎ মুসা আলাইহিস সালাম চলে যাওয়ার পরপরই। যে সময়টিতে তাদের কাছে শরীয়ত আসছিল, ঠিক সেই ফাঁকেই তারা শিরকে জড়িয়ে পড়ল।

“তোমরা জালিম ছিলে”: শিরক কেন সবচেয়ে বড় জুলুম

আয়াতের শেষে বলা হচ্ছে “ওয়া আনতুম জালিমুন” — আর তোমরা ছিলে জালিম। প্রশ্ন জাগতে পারে, বাছুর পূজার মধ্যে জুলুম কোথায়? উত্তর — শিরকই সবচেয়ে বড় জুলুম, যেমন আল্লাহ বলেছেন —

يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ ۖ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ

Yā bunayya lā tushrik bi-llāhi inna-sh-shirka la-zulmun ʿazīm

“হে আমার প্রিয় বৎস, আল্লাহর সাথে শিরক কোরো না; নিশ্চয়ই শিরক এক বিরাট জুলুম।”

জুলুমের ভাষাগত অর্থ কোনো কিছুকে তার যথাস্থানে না রাখা। কারো হক নষ্ট করাকে জুলুম বলি, কারণ যাকে হক দেওয়ার কথা তাকে না দিয়ে অন্যত্র দেওয়া হয়। ইবাদত একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য; সেই ইবাদত তাঁকে না দিয়ে অন্যকে দেওয়া তাই সবচেয়ে বড় জুলুম — ইবাদতকে তার যথাস্থান থেকে সরিয়ে ফেলা।

আরেকভাবেও এটি জুলুম। যে শিরক বা কুফরে লিপ্ত হয়ে আল্লাহর অবাধ্যতা করে, সে অন্য কারো ক্ষতি না করলেও জালিম — কারণ সে নিজেকে শাস্তিযোগ্য করে তুলেছে, নিজের প্রতিই কষ্ট ডেকে এনেছে। নিজেকে এভাবে শাস্তির যোগ্য বানানোই নিজের প্রতি জুলুম (জুলুম আন-নাফস)।

শিক্ষা

এই আয়াত একটি গভীর বৈপরীত্য তুলে ধরে: যে মুহূর্তে আল্লাহ তাদের জন্য শরীয়তের সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত প্রস্তুত করছিলেন, সেই মুহূর্তেই তারা শিরকে পতিত হলো — অনুগ্রহের ঠিক পাশেই অকৃতজ্ঞতা। আর “জালিম” শব্দটি মনে করিয়ে দেয়, শিরক কেবল একটি ভুল নয়, বরং সবচেয়ে বড় জুলুম — ইবাদতকে তার একমাত্র হকদার আল্লাহ থেকে সরিয়ে দেওয়া, এবং সেই সাথে নিজেকেই শাস্তিযোগ্য করে নিজের প্রতি জুলুম করা। তাই তাওহীদের উপর অবিচল থাকাই প্রকৃত ইনসাফ।