সূরা আল-বাকারা ২:৬২–৬৬: নাজাতের মানদণ্ড ও অবাধ্যতার পরিণতি
বনী ইসরাইলের ঘটনাবলির মাঝখানে এই পাঁচটি আয়াত একটি ধারাবাহিক পাঠ গড়ে তোলে — কে নাজাত পায় তার সর্বকালীন মূলনীতি (২:৬২) থেকে শুরু করে তূর পর্বতের অঙ্গীকার ও তা ভঙ্গ (২:৬৩–৬৪), এবং শনিবারের সীমালঙ্ঘন ও তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি (২:৬৫–৬৬) পর্যন্ত। একসঙ্গে এগুলো শেখায় প্রকৃত ঈমানের মানদণ্ড, আল্লাহর কিতাব দৃঢ়ভাবে ধারণ করার দায়িত্ব, এবং হারামকে হালালের চেহারা দেওয়ার ভয়ঙ্কর বিপদ।
নাজাতের সর্বকালীন মূলনীতি (২:৬২)
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالنَّصَارَىٰ وَالصَّابِئِينَ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ — সূরা আল-বাকারা, ২:৬২
Inna’lladhīna āmanū wa’lladhīna hādū wa’n-nasārā wa’s-sābiʾīna man āmana bi’llāhi wa’l-yawmi’l-ākhiri wa ʿamila sālihan fa-lahum ajruhum ʿinda rabbihim wa lā khawfun ʿalayhim wa lā hum yahzanūn
“নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, আর যারা ইহুদি হয়েছে, খ্রিস্টান ও সাবিঈন — তাদের মধ্যে যে-ই আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনবে এবং সৎকর্ম করবে, তাদের প্রতিদান রয়েছে তাদের রবের কাছে; তাদের কোনো ভয় নেই, আর তারা দুঃখিতও হবে না।”
জীবনের দুটি লক্ষ্য — কাঙ্ক্ষিত অর্জন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত থেকে মুক্তি। এই আয়াত দুটোরই আশ্বাস দেয়: প্রতিদান রবের কাছে, আর কোনো ভয় ও দুঃখ নেই। এটি একটি সর্বকালীন, টাইমলেস মূলনীতি — কেবল বর্তমানের জন্য নয়। এর অর্থ, যেকোনো যুগে যেকোনো জাতি যদি তাদের কাছে বিদ্যমান ওহী অনুযায়ী আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান আনে এবং বিদ্যমান শরীয়ত অনুযায়ী সৎকর্ম করে, তবে সে নাজাত পাবে। মূসা আলাইহিস সালামের যুগে যারা তাওরাত মেনে চলেছে, ঈসা আলাইহিস সালামের যুগে যারা তাঁর বার্তা মেনেছে — তারা মুক্তি পেয়েছে। আর যেখানে ওহী, নবী বা কিতাব অনুপস্থিত, সেখানে যে ব্যক্তি সহজাত ফিতরাতের টানে তাওহীদ বেছে নেয় ও শিরক থেকে মুক্ত থাকে, তার জন্যও নাজাত রয়েছে (যেমন নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের আগে কিছু একত্ববাদী মানুষ ছিলেন)।
‘সব ধর্ম সমান’ নয়: আল্লাহর প্রতি ঈমানের দাবি
এই আয়াত থেকে কেউ ভুল বুঝতে পারে যে যেকোনো ধর্ম পালন করলেই চলবে, কেবল আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস থাকলেই হলো। ‘সব ধর্মই সমান, যে যার ধর্ম পালন করলেই হলো’ — এই ধারণা সহনশীলতা নয়, বরং চরম বিভ্রান্তি; কেউ ধ্বংসের পথে থাকলে তাকে ‘তুমি ঠিক পথে আছ’ বলা কল্যাণ নয়, বরং তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া।
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ — সূরা আলে ইমরান, ৩:৮৫
Wa man yabtaghi ghayra’l-islāmi dīnan fa-lan yuqbala minhu wa huwa fi’l-ākhirati mina’l-khāsirīn
“আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন অন্বেষণ করে, তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না, আর আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”
প্রকৃত কল্যাণকামী সত্যটি বলে দেন, তা যতই অপ্রিয় হোক; মানুষ সাধারণত উপদেশদাতাকে ভালোবাসে না, তবু সত্যের দিকে ডাকাই প্রকৃত কল্যাণ। আসল কথা হলো, আল্লাহর প্রতি ঈমানের মধ্যেই তাঁর প্রেরিত সকল রাসূলের প্রতি ঈমান অন্তর্ভুক্ত। বিষয়টি একটি উদাহরণে স্পষ্ট: এক রাষ্ট্রপ্রধান একের পর এক একশ রাষ্ট্রদূত পাঠালেন, সবাইকে সম্মান দেওয়া হলো; কিন্তু একশ-এক নম্বর দূতকে হত্যা করা হলে প্রেরক যুদ্ধ ঘোষণা করবেন — কারণ সবাই সেই একই প্রধানের দূত, একজনকে অপমান মানে প্রেরককেই অপমান। তেমনি সকল নবীকে একই আল্লাহ পাঠিয়েছেন; একজনকে অস্বীকার করা মানে সকলকে ও স্বয়ং আল্লাহকে অস্বীকার করা। কুরআন একে ‘প্রকৃত কাফির’ বলেছে — যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের মধ্যে পার্থক্য করে বলে ‘কারও প্রতি ঈমান আনি, কাউকে অস্বীকার করি’, তারাই প্রকৃত কাফির (সূরা আন-নিসা, ৪:১৫০–১৫১)। আর আল্লাহ সকল নবীর কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছেন যে পরবর্তী সত্যায়নকারী রাসূল এলে তাঁকে মেনে নিতে হবে (সূরা আলে ইমরান, ৩:৮১); তাই মূসা ও ঈসা আলাইহিমাস সালাম উভয়েই শেষ নবীকে অনুসরণের আদেশ দিয়ে গেছেন।
وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَا يَسْمَعُ بِي أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ يَهُودِيٌّ وَلَا نَصْرَانِيٌّ، ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ، إِلَّا كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ — সহীহ মুসলিম
Wa’lladhī nafsu Muhammadin bi-yadihi, lā yasmaʿu bī ahadun min hādhihi’l-ummati yahūdiyyun wa lā nasrāniyyun, thumma yamūtu wa lam yuʾmin bi’lladhī ursiltu bihi, illā kāna min ashābi’n-nār
“সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! এই উম্মতের যে-ই আমার কথা শোনে — ইহুদি হোক বা খ্রিস্টান — অতঃপর আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি তাতে ঈমান না এনে মারা যায়, সে অবশ্যই জাহান্নামের অধিবাসী হবে।”
তাই ২:৬২-এর অর্থ দাঁড়ায় — এটি অতীতে নবীদের প্রকৃত অনুসারীদের জন্য প্রযোজ্য ছিল; আর শেষ নবীর আগমনের পর তাঁর প্রতি ঈমান আনা সকলের জন্য বাধ্যতামূলক, কারণ আল্লাহর প্রতি ঈমানের শর্তই তাঁর শেষ রাসূলকে মেনে নেওয়া। যেই মুহূর্তে কেউ শাহাদাহ ঘোষণা করে, সে আর ইহুদি-খ্রিস্টান-সাবিঈ থাকে না — মুমিন হয়ে যায়। এভাবে ‘কুরআন মানি সুন্নাহ মানি না’, কিংবা ‘যে যার ধর্মে থাকলেই মুক্তি’ — এসব ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
সাবিঈন ও আয়াতের প্রেক্ষাপট
সাবিঈন একটি প্রাচীন সম্প্রদায়, যাদের অস্তিত্ব এখনো আছে বলে বলা হয়; তারা ইরাক বা তার নিকটবর্তী অঞ্চলে, দজলা ও ফোরাত নদীর তীরে বাস করত। তারা প্রচলিত ধর্মসমূহ — ইহুদি, খ্রিস্টান, মাজুসি বা মূর্তিপূজা — কোনোটিই পুরোপুরি অনুসরণ করত না; সালাফের বক্তব্য ও ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে তাদের তিনটি উপবিভাগের কথা ধারণা করা যায় (একদল ফিতরাতভিত্তিক একত্ববাদী, একদল আহলে কিতাবের অনুসারী, একদল ফেরেশতা বা নক্ষত্র-পূজারী)। তবে অন্য সকল সম্প্রদায়ের মতো তাদের নাজাতের পথও এখন এক — শেষ নবীর প্রতি ঈমান।
লক্ষণীয়, এই সার্বজনীন মূলনীতি বনী ইসরাইলের ঘটনার মাঝখানে আসার একটি কারণ — তাদের একের পর এক অবাধ্যতা পড়ে যেন আমরা ভেবে না বসি যে তারা সবাই খারাপ; আল্লাহ ইঙ্গিত দিলেন, এদের মধ্যেও প্রকৃত ঈমানদার আছে, আর তারা মুক্তি পাবে। কেউ কেউ এর শানে নুযূল হিসেবে সালমান আল-ফারিসি রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন, যিনি নবীজিকে সেই মানুষদের পরিণতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যারা দাওয়াত পৌঁছার আগেই মারা গিয়েছিল। আয়াতের শেষ অংশে দুটি আশ্বাস — ‘কোনো ভয় নেই’ (ভবিষ্যতের আশঙ্কা থেকে মুক্তি) এবং ‘দুঃখিত হবে না’ (অতীতের আক্ষেপ থেকে মুক্তি)।
তূর পর্বতের অঙ্গীকার (২:৬৩)
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّورَ خُذُوا مَا آتَيْنَاكُم بِقُوَّةٍ وَاذْكُرُوا مَا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ — সূরা আল-বাকারা, ২:৬৩
Wa idh akhadhnā mīthāqakum wa rafaʿnā fawqakumu’ṭ-ṭūra khudhū mā ātaynākum bi-quwwatin wa’dhkurū mā fīhi laʿallakum tattaqūn
“আর স্মরণ করো, যখন আমি তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম এবং তোমাদের ওপর তূর পর্বতকে তুলে ধরলাম — ‘আমি তোমাদের যা দিয়েছি তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং এতে যা আছে তা স্মরণ রাখো, যেন তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারো।'”
এই ঘটনার পটভূমি: ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি, তাওরাত লাভ, বাছুরপূজা ও তা থেকে তওবা, এরপর তাওরাত ধারণে অস্বীকৃতি — শেষে আল্লাহ তাদের মাথার ওপর পর্বত তুলে ধরলে তারা তাওরাত মেনে চলার অঙ্গীকার নিল। ‘তূর’ শব্দের অর্থ নিয়ে তাফসীরে তিনটি মত রয়েছে (একটি নির্দিষ্ট পর্বতের নাম / সাধারণভাবে পর্বত / উদ্ভিদবিশিষ্ট পর্বত); এখানে প্রচলিত অনুবাদ ‘তূর পর্বত’ রাখা হয়েছে।
আল্লাহ যেমন তাওরাত দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে বলেছেন, তেমনি আমাদের কুরআনকে আঁকড়ে ধরতে হবে। আলিমগণ বলেছেন, ‘দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা’র অর্থ কিতাবের বিধিনিষেধ কোনো শৈথিল্য ছাড়া মেনে চলতে সর্বাত্মক চেষ্টা করা; আর ‘এতে যা আছে স্মরণ রাখা’র অর্থ কেবল শব্দ মুখস্থ করা নয়, বরং কিতাব অধ্যয়ন করা, চিন্তা করা, রক্ষা করা ও সে অনুযায়ী আমল করা। এখান থেকেই বোঝা যায় কুরআনের সাথে আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত — অথচ অনেক সময় কুরআন কেবল আনুষ্ঠানিক ব্যবহারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে (মৃতের জন্য খতম, তাবিজ, শোকেসে সাজানো, বড়জোর রমজানে একবার খতম), আর এর অর্থ-অধ্যয়ন ও বাস্তবায়ন থেকে যায় অনুপস্থিত।
তবু মুখ ফিরিয়ে নেওয়া (২:৬৪)
ثُمَّ تَوَلَّيْتُم مِّن بَعْدِ ذَٰلِكَ ۖ فَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ لَكُنتُم مِّنَ الْخَاسِرِينَ — সূরা আল-বাকারা, ২:৬৪
Thumma tawallaytum min baʿdi dhālika fa-lawlā fadlu’llāhi ʿalaykum wa rahmatuhu la-kuntum mina’l-khāsirīn
“এরপরও তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে; আর তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়া না থাকলে তোমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে।”
পর্বতের ছায়ায় নেওয়া অঙ্গীকারও তাদের ধরে রাখতে পারল না — এত কিছুর পরও তারা মুখ ফিরিয়ে নিল। তবু তারা যে ধ্বংস হয়ে যায়নি, তা তাদের কৃতিত্ব নয়, বরং আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত। এটি আমাদের জন্যও আয়না: আমাদের যে যেটুকু অবস্থান, তা আমাদের অর্জন নয়, বরং আল্লাহর অনুগ্রহেরই আবরণ।
শনিবারের সীমালঙ্ঘন (২:৬৫)
وَلَقَدْ عَلِمْتُمُ الَّذِينَ اعْتَدَوْا مِنكُمْ فِي السَّبْتِ فَقُلْنَا لَهُمْ كُونُوا قِرَدَةً خَاسِئِينَ — সূরা আল-বাকারা, ২:৬৫
Wa laqad ʿalimtumu’lladhīna’ʿtadaw minkum fi’s-sabti fa-qulnā lahum kūnū qiradatan khāsiʾīn
“আর তোমরা অবশ্যই তাদের কথা জানো, তোমাদের মধ্যে যারা শনিবারের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করেছিল; তখন আমি তাদের বললাম, ‘তোমরা ঘৃণিত বানর হয়ে যাও।'”
শনিবারের সীমালঙ্ঘনের কারণে বনী ইসরাইলের একটি গোষ্ঠীকে আল্লাহ বানরে রূপান্তরিত করে দিলেন — আরবিতে একে বলা হয় ‘মাসখ’। শনিবার ছিল ইহুদিদের ইবাদতের দিন; বর্ণিত পটভূমি অনুযায়ী মূল দিন ছিল জুমা, কিন্তু তারা নিজেদের যুক্তিতে শনিবারকে বেছে নেওয়ায় তা-ই তাদের ওপর নির্ধারিত হলো (তুলনীয় সূরা আন-নাহল, ১৬:১২৪)। তাওরাতের বিধান কঠোর ছিল, কারণ সেই প্রজন্ম বারবার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়েছিল, আর কঠোরতা ছিল তাদের সেই অবস্থার উপযুক্ত — যেমন একজন কঠিন-হৃদয় অপরাধীকে কারাগারেও অতিরিক্ত বেড়ি পরাতে হয়। মানুষ ও পরিস্থিতির ভেতরের বাস্তবতা না জেনেই আমরা অনেক সময় প্রশ্ন তুলি, ‘এত কঠোরতা কেন’, কিংবা ‘এই বিপদটাই বা কেন এল’।
গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা — আল্লাহর আদেশ-নিষেধের সঙ্গে আসে পরীক্ষা, আর তা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা উচিত। দাড়ির কারণে চাকরি না পাওয়া, সুদ থেকে বাঁচতে গিয়ে জীবিকা কঠিন হওয়া, পর্দার জন্য কটু কথা শোনা, দ্বীনদার জীবনসঙ্গীর অপেক্ষায় বিয়ে আটকে থাকা — এগুলোই সেই মুহূর্তের পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় হেরে গিয়ে অনেকে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে আপসকে জায়েজ বানায়; প্রকৃত সমাধান আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করা ও ধৈর্য ধরা।
وَاسْأَلْهُمْ عَنِ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَتْ حَاضِرَةَ الْبَحْرِ إِذْ يَعْدُونَ فِي السَّبْتِ إِذْ تَأْتِيهِمْ حِيتَانُهُمْ يَوْمَ سَبْتِهِمْ شُرَّعًا وَيَوْمَ لَا يَسْبِتُونَ لَا تَأْتِيهِمْ ۚ كَذَٰلِكَ نَبْلُوهُم بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ — সূরা আল-আরাফ, ৭:১৬৩
Wa’s-alhum ʿani’l-qaryati’llatī kānat hādirata’l-bahri idh yaʿdūna fi’s-sabti idh taʾtīhim hītānuhum yawma sabtihim shurraʿan wa yawma lā yasbitūna lā taʾtīhim. Kadhālika nablūhum bimā kānū yafsuqūn
“আর তাদের জিজ্ঞেস করো সেই জনপদ সম্পর্কে, যা ছিল সাগরের তীরে — যখন তারা শনিবারের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করত; যখন তাদের মাছগুলো শনিবারে ঝাঁকে ঝাঁকে ভেসে আসত, আর যেদিন তারা শনিবার পালন করত না সেদিন আসত না। এভাবেই আমি তাদের পরীক্ষা করেছিলাম, কারণ তারা সীমালঙ্ঘন করত।”
সাগরতীরের এই জাতির জীবিকা ছিল মাছ ধরা; আল্লাহ পরীক্ষা করলেন — শনিবারে (যখন মাছ ধরা নিষিদ্ধ) মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে আসত, অন্য দিনে নয়। এরপর তারা একটি কৌশল বের করল। এ প্রসঙ্গের বিস্তারিত বিবরণ তাফসীরে ইসরাইলিয়াত হিসেবে এসেছে — এ ধরনের বর্ণনা উল্লেখ করা জায়েজ, তবে প্রমাণ ছাড়া তা নিশ্চিতভাবে সত্য বা মিথ্যা বলা যায় না, আর কুরআন-হাদিসের বিরোধী হলে প্রত্যাখ্যাত। কোনো বর্ণনায় এসেছে, তারা শনিবারে মাছ বেঁধে পানিতেই রেখে রোববারে তুলত; অন্য বর্ণনায়, তারা খাল কেটে জোয়ারের মাছ শনিবারে আটকে ফেলে রোববারে সংগ্রহ করত। উভয় ক্ষেত্রেই তারা কৌশলে হারাম কাজটাই করল, অথচ তাকে হালালের চেহারা দিল। সূরা আল-আরাফে দেখা যায়, জনপদটি তিন দলে বিভক্ত হয়েছিল — এক দল বাধা দিয়েছিল, এক দল অপকর্ম করত, আর তৃতীয় দল ছিল নিষ্ক্রিয় (‘নিষেধ করে লাভ কী?’)। শেষে সীমালঙ্ঘনকারীরা নির্লজ্জভাবে চালিয়ে গেলে আল্লাহ তাদের বানরে রূপান্তরিত করে দিলেন।
একটি ভুল ধারণার নিরসন প্রয়োজন: এই রূপান্তর কোনোভাবেই বানর প্রজাতির উৎপত্তি নয়। আল্লাহ বানরকে আলাদাভাবে বানর হিসেবেই সৃষ্টি করেছেন; বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী রূপান্তরিত এই মানুষগুলো বেঁচে থাকেনি বা বংশবিস্তার করেনি। আয়াতটি বংশগত উৎপত্তির কোনো দাবিই করে না।
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি (২:৬৬)
فَجَعَلْنَاهَا نَكَالًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهَا وَمَا خَلْفَهَا وَمَوْعِظَةً لِّلْمُتَّقِينَ — সূরা আল-বাকারা, ২:৬৬
Fa-jaʿalnāhā nakālan limā bayna yadayhā wa mā khalfahā wa mawʿizatan li’l-muttaqīn
“অতঃপর আমি এটিকে করলাম দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি — যারা সে সময়ে উপস্থিত ছিল এবং যারা পরে আসবে তাদের জন্য, আর মুত্তাকীদের জন্য উপদেশ।”
আল্লাহ এই শাস্তিকে অতীত ও ভবিষ্যৎ — উভয় প্রজন্মের গুনাহের জন্য দৃষ্টান্তমূলক করলেন, আর মুত্তাকীদের জন্য একটি হৃদয়স্পর্শী উপদেশ, যা পড়ে তারা সাবধান হয়। এই একই প্রবণতা — ছলচাতুরিতে হারামকে হালালের চেহারা দেওয়া — আজও বিদ্যমান। একটি দৃষ্টান্ত পরিকল্পিত হিল্লা বিয়ে: ইসলামের বিধানে তিন তালাকের পর প্রথম স্বামী স্ত্রীকে সরাসরি ফিরিয়ে নিতে পারে না; সেই নারী স্বাভাবিকভাবে অন্যত্র বিয়ে করে সেই বিয়ে স্বাভাবিকভাবে ভেঙে গেলে তবেই প্রথম স্বামী পুনরায় বিয়ে করতে পারে। কিন্তু কেউ কেউ পূর্বপরিকল্পনা করে এক রাতের চুক্তিভিত্তিক বিয়ের কৌশলে একে হারামকে হালালের চেহারা দেয়।
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُحَلِّلَ وَالْمُحَلَّلَ لَهُ — সুনানে তিরমিযী
Laʿana rasūlu’llāhi sallā’llāhu ʿalayhi wa sallama’l-muhallila wa’l-muhallala lah
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিল্লাকারী (মুহাল্লিল) এবং যার জন্য হিল্লা করা হয় (মুহাল্লাল লাহু) — উভয়কে লানত করেছেন।”
একই প্রবণতার আরও উদাহরণ চারপাশে অনেক — সুদকে ‘ইন্টারেস্ট’ নাম দিয়ে, কিংবা মাদক ও মদকে ভিন্ন নাম দিয়ে বৈধতার চেহারা দেওয়া। নাম বা পদ্ধতি বদলালেও বস্তুর হুকুম বদলায় না।
শিক্ষা
এই পাঁচটি আয়াত একসঙ্গে প্রকৃত ঈমানের মানদণ্ড ও অবাধ্যতার পরিণতিকে আমাদের সামনে ধরে। নাজাতের মূলনীতি সর্বকালীন, তবে ‘যে যার ধর্মে থাকলেই মুক্তি’ নয় — আল্লাহর প্রতি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত তাঁর সকল রাসূল, আর শেষ নবীর পর তাঁকে মেনে নেওয়া অপরিহার্য। কিতাবকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা মানে তাকে অধ্যয়ন ও বাস্তবায়ন করা, কেবল আনুষ্ঠানিক সম্মান নয়। অঙ্গীকার ভেঙেও যে ধ্বংস থেকে রক্ষা মেলে, তা মানুষের কৃতিত্ব নয়, আল্লাহর রহমত। আর সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা — নিষিদ্ধকে বৈধের পোশাক পরানোর প্রবণতা প্রতিটি যুগের, আমাদেরও। এই গোটা পাঠ কোনো অতীত জাতিকে ছোট করার জন্য নয়; বরং নিজেদের ঈমান, নিজেদের কৌশল ও নিজেদের পরীক্ষাকে ওহীর মানদণ্ডে যাচাই করার এক আয়না।