সূরা আল-বাকারা: বনু ইসরাইল প্রসঙ্গের ভূমিকা — সূরা ফাতিহার দোয়া ও তিন ফায়দা

সূরা আল-ফাতিহায় আমরা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়াটি করি — হিদায়াতের দোয়া, “ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম,” আমাদের সরল পথ দেখান। আর এই দোয়ারই শেষাংশে সেই পথের পরিচয় দেওয়া হয়েছে — এটি কাদের পথ, আর কাদের পথ নয়। বনু ইসরাইলকে নিয়ে সূরা বাকারার যে আলোচনায় আমরা আছি, তা প্রকৃতপক্ষে এই দৈনন্দিন দোয়ার সাথেই গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট।

اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ ۝ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ

Ihdinā-s-sirāta-l-mustaqīm, sirāta-lladhīna anʿamta ʿalayhim ghayri-l-maghdūbi ʿalayhim wa la-d-dāllīn

“আমাদের সরল পথ দেখান — তাদের পথ, যাদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ করেছেন; তাদের পথ নয় যারা ক্রোধের পাত্র, আর যারা পথভ্রষ্ট তাদেরও নয়।”

সরল পথ চেনা: তিন দলকে চেনা

সরল পথের হিদায়াত চাইতে হলে আগে পথটিকে চিনতে হবে, আর পথ চিনতে হলে চিনতে হবে তিন দল মানুষকে। প্রথম দল — যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন (“আনআমতা আলাইহিম”): নবী-রাসূল, সিদ্দিক, শহীদ ও সৎকর্মশীলগণ। দ্বিতীয় দল — যারা ক্রোধের পাত্র (“মাগদুব আলাইহিম”)। তৃতীয় দল — যারা পথভ্রষ্ট (“দাল্লিন”)। আমরা যে পথ চাই, তা প্রথম দলের পথ; আর বাকি দুই দলের পথ থেকে আশ্রয় চাই।

এখান থেকেই কুরআনের বিন্যাসের এক অপূর্ব যোগসূত্র ফুটে ওঠে। প্রথম দর্শনে কুরআনের ক্রম দেখে মনে হতে পারে কোনটার সাথে কোনটার সংযোগ নেই, কিন্তু একটু চিন্তা করলেই বিস্ময়কর সব যোগসূত্র চোখে পড়ে। ক্রোধের পাত্রদের (মাগদুব আলাইহিম) চিনতে হলে পড়তে হবে সূরা আল-বাকারা — এ কারণেই সূরার শুরু থেকেই আল্লাহ তাদের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন, আর আজকের আয়াতগুলোতেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। এরপরের সূরা আলে-ইমরানে চিনিয়ে দেওয়া হবে পথভ্রষ্টদের (দাল্লিন) — নাসারা তথা খ্রিস্টানদের পথ। ক্লাসিক্যাল ব্যাখ্যায় তাই বাকারাকে যুক্ত করা হয় মাগদুব আলাইহিমের সাথে, আর আলে-ইমরানকে দাল্লিনের সাথে — সূরা ফাতিহার পরে এই দুই সূরার এমন বিন্যাসের পেছনে একটি সুন্দর তাৎপর্য নিহিত।

প্রথম ফায়দা: আত্মসংশোধন

এই আলোচনা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, মূলত তিনটি কারণে। প্রথম কারণ — আত্মসংশোধন। বনু ইসরাইল ছিল আমাদের পূর্ববর্তী সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত, যাদের মধ্যে আল্লাহ বহু নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন; তবু তারা বারবার পদস্খলিত হয়েছে। কেন, আর তার কারণগুলো কী — তা জানা আমাদের জন্য জরুরি। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর একটি উক্তি থেকে ইঙ্গিত মেলে যে, এই লোকেরা চলে গেছে, কিন্তু উদ্দেশ্য প্রকৃতপক্ষে তোমরাই। তারা যেন আমাদের বড় ভাইয়ের মতো; তাদের দোষ-ত্রুটি আমাদের সামনে তুলে ধরে আমাদের সতর্ক করা হচ্ছে, যেন আমরা একই পদস্খলনে না পড়ি। আর বাস্তবতা হলো, আমাদের মুসলিম উম্মাহর মধ্যেও আজ একই ধরনের পদস্খলন দেখা যায়।

দ্বিতীয় ফায়দা: নবীর সত্যতার প্রমাণ

দ্বিতীয় কারণ — এই আলোচনা নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্যতার এক বড় প্রমাণ। এই আয়াতগুলো যখন অবতীর্ণ হয়, তখন তিনি ছিলেন একজন উম্মি তথা নিরক্ষর নবী — কুরআনেই তাঁকে “উম্মি নবী” বলা হয়েছে। সাধারণভাবে নিরক্ষরতা কোনো গৌরবের বিষয় নয়, কিন্তু নবীর ক্ষেত্রে এটি গৌরবের, কারণ এটিই প্রমাণ করে যে এই কুরআন তাঁর নিজের রচনা নয় — তিনি সত্যিই আল্লাহর রাসূল।

এই আয়াতগুলো এসেছে মাদানী যুগে, যখন মুসলিমরা ইহুদিদের খুব কাছাকাছি বাস করত। ইহুদিরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মেনে নেয়নি, আপাদমস্তক তাঁর বিরোধিতা করেছে; আব্দুল্লাহ ইবনু সালামের মতো ইহুদি পন্ডিত যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবী হয়েছেন, তাঁদের সংখ্যা খুবই কম। অথচ একজন নিরক্ষর নবী ইহুদিদের সাথে মুসা আলাইহিস সালামের ঘটনা, তাদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস, তাদের প্রতি নেওয়া অঙ্গীকার — এসব নির্ভুলভাবে বললেন। এসব বানিয়ে বলা অসম্ভব; আর সামান্যতম ভুল থাকলেও ইহুদি পন্ডিতরা সঙ্গে সঙ্গে ধরিয়ে দিত — “এগুলো আমাদের তাওরাতে নেই, আমাদের পূর্বপুরুষদের সাথে ঘটেনি।” কিন্তু চূড়ান্ত বিরোধিতার মুহূর্তেও তারা এই আপত্তি তুলতে পারেনি; তারা চুপ থেকে গেছে। এটি ইসলামের সত্যতা ও কুরআন যে আল্লাহর বাণী তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। তাই দাওয়াতের ক্ষেত্রে সংশয়গ্রস্ত কাউকে বলা যায় — ঠান্ডা মাথায় দুটি জিনিস পড়ুন: আল কুরআন, আর নবীজীবনী।

এখানে একটি সতর্কতাও প্রাসঙ্গিক। আমরা প্রায়ই “সাইন্টিফিক মিরাকল” বা গাণিতিক অলৌকিকতার পেছনে ছুটি — বিজ্ঞানের অগ্রগতির যুগে কুরআন থেকে বিজ্ঞানের কিছু বলা হলেই যাচাই না করে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ি, এমনকি দাবিটি ভুল হলেও। এর প্রয়োজন নেই। কুরআনে সাইন্টিফিক মিরাকল আছে সন্দেহ নেই, কিন্তু কুরআনের অলৌকিকত্ব কেবল সেখানেই সীমাবদ্ধ নয় — বরং নানা ধরনের নিদর্শন বারবার স্পষ্ট করে দেয় যে এই কুরআন মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ ছাড়া আর কারো পক্ষ থেকে আসা সম্ভব নয়।

তৃতীয় ফায়দা: গল্প ও ইসরাইলিয়াতের অনুমতি

তৃতীয় কারণ — গল্পের স্বাভাবিক আকর্ষণ। মানুষ গল্প ভালোবাসে, এটি আমাদের স্বভাব। কুরআন-হাদিসে ঘটনার বিস্তারিত খুব একটা নেই, কারণ মূল উদ্দেশ্য শিক্ষা গ্রহণ; কিন্তু ইসলাম আমাদের এই জানার কৌতূহলকে দমন করে দেয়নি, বরং ইসরাইলিয়াত — বনু ইসরাইল থেকে বর্ণিত কাহিনী — বর্ণনার অনুমতি দিয়েছে। এটিকে আল্লাহর এক রহমত বলা যায়। সালাফগণও তা বর্ণনা করেছেন, তাই প্রাচীন তাফসীরে এই ঘটনাগুলো পাওয়া যায়। এসবের প্রতিটি বিবরণ বিশ্বাস করা যাবে না — এর মধ্যে অনেক ভুলও আছে — কিন্তু সাংঘর্ষিক নয় এমন কিছু তথ্য নিয়ে ঘটনার শূন্যস্থান পূরণ করলে আমাদের সামনে একটি চিত্র ভেসে ওঠে, যা বোঝার কাজে সহায়ক হয়।

শিক্ষা

সূরা ফাতিহায় আমরা প্রতিদিন যে সরল পথ প্রার্থনা করি, সেই পথ চেনার জন্যই ক্রোধের পাত্র ও পথভ্রষ্টদের চেনা প্রয়োজন — আর সূরা বাকারার বনু ইসরাইল-অধ্যায় সেই পরিচয়েরই সূচনা। এই আলোচনা একদিকে আমাদের আত্মসংশোধনের আয়না, কারণ পূর্ববর্তীদের পদস্খলন আজও আমাদের মধ্যে প্রতিফলিত; অন্যদিকে এটি নিরক্ষর নবীর সত্যতা ও কুরআনের ঐশী উৎসের এক জীবন্ত প্রমাণ। আর ইসরাইলিয়াতের অনুমতি আমাদের কৌতূহল মিটিয়ে ঘটনার পূর্ণ চিত্র বুঝতে সাহায্য করে — শর্ত একটাই, প্রতিটি বিবরণকে যাচাই না করে সত্য বলে ধরে না নেওয়া।