ঈমানের কষ্টিপাথর: প্রকৃত নির্বোধ কারা

আগের দুটি আয়াতে আমরা দেখেছি মুনাফিকরা কীভাবে পৃথিবীতে ফাসাদ ছড়িয়েও নিজেদের সংশোধনকারী মনে করে, আর নিজেদের আত্মপ্রবঞ্চনা টেরও পায় না। এবার আয়াত তাদের আরেকটি স্বরূপ উন্মোচন করে — বিশ্বাসীদের প্রতি তাদের অবজ্ঞা। আর এই অবজ্ঞা প্রকাশ করতে গিয়ে আয়াতটি আমাদের হাতে তুলে দেয় সহীহ ঈমানের একটি মানদণ্ড।

وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا كَمَا آمَنَ النَّاسُ قَالُوا أَنُؤْمِنُ كَمَا آمَنَ السُّفَهَاءُ ۗ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ السُّفَهَاءُ وَلَٰكِن لَّا يَعْلَمُونَ — সূরা আল-বাকারা, ২:১৩

Wa idhā qīla lahum āminū kamā āmana’n-nāsu qālū a-nuʾminu kamā āmana’s-sufahāʾu. Alā innahum humu’s-sufahāʾu wa lākin lā yaʿlamūn

“আর যখন তাদের বলা হয়, ‘মানুষ যেভাবে ঈমান এনেছে, তোমরাও সেভাবে ঈমান আনো’, তখন তারা বলে, ‘আমরা কি নির্বোধদের মতো ঈমান আনব?’ জেনে রাখো, তারাই তো নির্বোধ, কিন্তু তারা জানে না।”

‘মানুষের মতো ঈমান আনো’: মানুষ বলতে সাহাবীগণ

মুনাফিকদের বলা হয়, বাকি সকল মানুষ যেভাবে ঈমান এনেছে তোমরাও সেভাবে ঈমান আনো — অর্থাৎ তাদের মতো প্রকৃতভাবে, অন্তর থেকে ঈমান আনো; কেবল মৌখিক ঘোষণা নয়, বরং অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমলের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করো। এখানে ‘মানুষ’ বলতে কারা, সে ব্যাপারে মুফাসসিরগণ একমত — এখানে সাহাবীদের কথাই বলা হয়েছে, কারণ সে সময় সাহাবীগণ ছাড়া আর কোনো ঈমানদার ছিলেন না। সাহাবীগণ যেমনিভাবে আল্লাহ, ফেরেশতা, নবী-রাসূল, কিতাব, মৃত্যুপরবর্তী জীবন প্রভৃতি সম্পর্কে প্রাপ্ত সংবাদের সত্যতাকে মৌখিক স্বীকৃতির পাশাপাশি অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাসের মাধ্যমে সত্যনিষ্ঠভাবে গ্রহণ করেছেন এবং আল্লাহর আদেশ পালন করেছেন — মুনাফিকদের বলা হচ্ছে, তোমরাও সেভাবে ঈমান আনো।

ঈমানের মানদণ্ড সাহাবীদের ঈমান

এই আয়াত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আমাদের বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করে। আল কুরআন গভীরভাবে পড়লে এর ভেতরে এমন সব মূলনীতি পাওয়া যায় যা বিভ্রান্তি থেকে বাঁচায়; এটি তারই একটি। আয়াতটি প্রমাণ করে, আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য ঈমান হলো সাহাবীদের ঈমান। এজন্য কেউ যদি বলে, ‘আমি কেবল কুরআন মানি, এর বাইরে কিছু মানি না’, সে স্পষ্টতই বিভ্রান্ত। কারণ আপনি যদি সত্যিই কুরআন মানেন, তবে কুরআনই তো নির্দেশ দিচ্ছে — ‘মানুষ যেভাবে ঈমান এনেছে সেভাবে ঈমান আনো’, আর এখানে ‘মানুষ’ বলতে সাহাবীগণ ছাড়া কেউ নন। কাজেই সাহাবীদের ঈমান কী ছিল, তা আপনাকে জানতেই হবে। সাহাবীগণ ঈমানের কষ্টিপাথর, আর এই আয়াত প্রমাণ করে যে আল্লাহ সাহাবীদের দ্বীন-বোঝাপড়াকে সংরক্ষিত রাখবেন।

সাহাবীদের ‘নির্বোধ’ বলা: নিফাকের লক্ষণ

এবার দেখুন মুনাফিকরা কী জবাব দেয় — ‘আমরা কি নির্বোধদের মতো ঈমান আনব?’ অর্থাৎ তারা সাহাবীদের নির্বোধ বলছে। কী সাংঘাতিক কথা! এজন্য যখনই দেখবেন কেউ সাহাবীদের প্রতি কোনো ধরনের বিদ্বেষ পোষণ করছে বা বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, বুঝে নেবেন সেখান থেকে নিফাকের গন্ধ আসছে; সাবধান হোন, কারণ এটি মুনাফিকির একটি লক্ষণ। মুনাফিকদের মনোভাব হলো — সাহাবীরা নির্বোধ ছিলেন, দ্বীন বুঝতেন না, আমরা তাঁদের চেয়ে ভালো বুঝি; আমরা নিজেদের মতো করে কুরআন ব্যাখ্যা করব, নবীর ব্যাখ্যা বা সাহাবীদের ব্যাখ্যা নেব না। এটিই নিফাক। লক্ষণীয়, এই আয়াতের পরতে পরতে আকিদার মূলনীতি বেরিয়ে আসছে, যদি আমরা কুরআন যথাযথভাবে অধ্যয়ন করি।

সুফাহা শব্দের অর্থ

‘সুফাহা’ শব্দের অর্থ নির্বোধ। শব্দটিকে একটু ভেঙে দেখা যাক। ‘সাফীহ’ শব্দের বহুবচন ‘সুফাহা’। ‘সাফীহ’ অর্থ যার বুদ্ধি অপরিপক্ব, যে কল্যাণ ও অকল্যাণ সম্পর্কে অজ্ঞ — যে বুঝতে পারে না কীসে কল্যাণ আর কীসে ক্ষতি। ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, এটি চরম অজ্ঞ ব্যক্তি — কোথায় কল্যাণ তা সে জানেই না, বরং যেটার মধ্যে ক্ষতি আছে সেটাই বেছে নেয়।

শরীয়তে এই শব্দের একটি প্রায়োগিক দিকও আছে। কেউ যদি সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপরিপক্ব হয় — বয়স হয়তো আঠারো-বিশ হয়ে গেছে, কিন্তু সে কেবল খারাপ কাজে অর্থ ব্যয় করে, অর্থের অপচয় করে, বারবার ঠকে যায়, হারামের পেছনে সম্পদ নষ্ট করে — তবে ইসলামের বিধানে সে ‘সাফীহ’। এমন ব্যক্তির ওপর শরীয়ত বিধিনিষেধ আরোপ করে, যেন সে সম্পদ নষ্ট করতে না পারে। আঠারো-বিশ বছর বয়স হলেও তার জন্য একজন অভিভাবক নির্ধারণ করে দেওয়া হয়; তার সম্পদ সংরক্ষিত থাকে, অভিভাবক তার পক্ষে তা ব্যয় করেন, আর তার হাতে সরাসরি অর্থ তুলে দেওয়া হয় না — কারণ সে নির্বোধ।

কোন অর্থে তারা সাহাবীদের নির্বোধ ভাবছে

তাহলে মুনাফিকরা কোন অর্থে সাহাবীদের নির্বোধ বলছে? মুনাফিকরা যে চালাকিটা করছে, তাদের ধারণায় সাহাবীগণ সেটা বুঝতে পারছেন না — অর্থাৎ মুখে ‘আমি মুসলিম’ বলে দিলেই তো সব সুবিধা পাওয়া যায়। মুসলিম পরিচয়ে বিয়ে-শাদি করা যায়, উত্তরাধিকার পাওয়া যায়, মৃত্যুর পর মুসলিমরা জানাজা পড়ে, মুসলিম কবরস্থানে দাফন হয়, মুসলিম পরিচয়ে সমাজে মিলেমিশে থাকা যায় — অথচ ভেতরে প্রকৃত ঈমান বা আমল আছে কিনা, এমনকি কেউ নামাজ পড়ে কিনা, তা কেউ যাচাই করতে যায় না। মুনাফিকের হিসেবে এই সহজ ‘বুদ্ধি’টাই সাহাবীগণ বোঝেননি। এর বদলে তাঁরা মনেপ্রাণে মুসলিম হওয়ার দাবি করেছেন এবং ইসলাম বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কত না ত্যাগ স্বীকার করেছেন। মুনাফিকের গণনায় এই সততা ও ত্যাগই যেন বোকামি — বিরাট বোকামি।

আল্লাহর রায়

এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ঠিক আগের আয়াতের মতোই একই ভাষায়, একই চারটি জোরালো তাকিদ দিয়ে জবাব দেন — ‘জেনে রাখো, তারাই তো নির্বোধ, কিন্তু তারা জানে না’ (Alā innahum humu’s-sufahāʾu wa lākin lā yaʿlamūn)। এখানেও সেই ‘আলা’, ‘ইন্না’, বাড়তি সর্বনাম ‘হুম’ এবং নির্দিষ্টতাবাচক ‘আল’ — চারটি উপকরণেই জোর দেওয়া হয়েছে যে প্রকৃত নির্বোধ তারাই। কেবল একটি শব্দ বদলেছে: আগের আয়াত শেষ হয়েছিল ‘তারা উপলব্ধি করে না’ (লা ইয়াশউরূন) দিয়ে, আর এই আয়াত শেষ হচ্ছে ‘তারা জানে না’ (লা ইয়ালামূন) দিয়ে। যে চিরস্থায়ী প্রতিদান ছেড়ে সামান্য পার্থিব সুবিধা কিনে নেয়, প্রকৃত নির্বোধ তো সে-ই — অথচ সে তা জানেও না।

শিক্ষা

এই আয়াত একদিকে সাহাবীগণকে গ্রহণযোগ্য ঈমানের কষ্টিপাথর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, অন্যদিকে সতর্ক করে যে সাহাবীদের অবজ্ঞা বা তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ নিফাকের একটি চিহ্ন। আয়াতটি বোকামির সংজ্ঞাও পাল্টে দেয়: প্রকৃত বোকামি বিশ্বাসীর আন্তরিক ত্যাগ নয়, বরং মুনাফিকের সেই হিসেবি চালাকি, যা চিরস্থায়ীকে বিসর্জন দিয়ে ক্ষণস্থায়ীকে কিনে নেয় — আর এমন বোকামি, যা সে নিজেই দেখতে পায় না। সহীহ ঈমানের মাপকাঠি নিজের ধারণা নয়, বরং প্রথম প্রজন্মের বিশ্বাসীগণ যেভাবে বিশ্বাস করেছেন ও বুঝেছেন সেভাবেই বিশ্বাস করা ও বোঝা।