সূরা আল-বাকারা: আয়াত ৮৩–৮৬ — অঙ্গীকার, তাওহীদ ও সদাচরণ, এবং খণ্ডিত আনুগত্যের পরিণাম

বনি ইসরাইলের দীর্ঘ বিশ্লেষণের ধারাবাহিকতায় এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা তাদের কাছ থেকে নেওয়া দুটি দৃঢ় অঙ্গীকারের (মিসাক) কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। প্রথম অঙ্গীকার—কেবল আল্লাহর ইবাদত করা, মা-বাবা-আত্মীয়-ইয়াতিম-অভাবীদের প্রতি সদাচরণ করা, মানুষকে উত্তম কথা বলা, সালাত কায়েম ও যাকাত আদায় করা; কিন্তু অল্প কিছু লোক ছাড়া তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। দ্বিতীয় অঙ্গীকার—একে অপরের রক্তপাত না করা ও একে অপরকে ঘরছাড়া না করা; অথচ তারা গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে স্বজাতিকে হত্যা ও বিতাড়ন করেছে, আবার মুক্তিপণের বেলায় তাওরাতের দোহাই দিয়েছে—অর্থাৎ কিতাবের একাংশ মেনে আরেক অংশ অস্বীকার করেছে। এই বিবরণের উদ্দেশ্য তাদের প্রতি বিষোদ্‌গার নয়, বরং আমাদের নিজেদের সতর্ক হওয়া।

وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِيٓ إِسْرَآئِيلَ لَا تَعْبُدُونَ إِلَّا ٱللَّهَ وَبِٱلْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَذِي ٱلْقُرْبَىٰ وَٱلْيَتَامَىٰ وَٱلْمَسَاكِينِ وَقُولُوا۟ لِلنَّاسِ حُسْنًا وَأَقِيمُوا۟ ٱلصَّلَاةَ وَآتُوا۟ ٱلزَّكَاةَ ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ إِلَّا قَلِيلًا مِّنكُمْ وَأَنتُم مُّعْرِضُونَ ۝ وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ لَا تَسْفِكُونَ دِمَاءَكُمْ وَلَا تُخْرِجُونَ أَنفُسَكُم مِّن دِيَارِكُمْ ثُمَّ أَقْرَرْتُمْ وَأَنتُمْ تَشْهَدُونَ ۝ ثُمَّ أَنتُمْ هَٰٓؤُلَآءِ تَقْتُلُونَ أَنفُسَكُمْ وَتُخْرِجُونَ فَرِيقًا مِّنكُم مِّن دِيَارِهِمْ تَظَاهَرُونَ عَلَيْهِم بِٱلْإِثْمِ وَٱلْعُدْوَانِ وَإِن يَأْتُوكُمْ أُسَارَىٰ تُفَادُوهُمْ وَهُوَ مُحَرَّمٌ عَلَيْكُمْ إِخْرَاجُهُمْ ۚ أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ ٱلْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَآءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي ٱلْحَيَاةِ ٱلدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ ٱلْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰٓ أَشَدِّ ٱلْعَذَابِ ۗ وَمَا ٱللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ ۝ أُو۟لَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ ٱشْتَرَوُا۟ ٱلْحَيَاةَ ٱلدُّنْيَا بِٱلْآخِرَةِ ۖ فَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمُ ٱلْعَذَابُ وَلَا هُمْ يُنصَرُونَ

অনুবাদ: আর স্মরণ কর, যখন আমরা বনি ইসরাইলের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছিলাম: তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করবে না; মা-বাবা, নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম ও অভাবীদের প্রতি সদাচরণ করবে; মানুষকে উত্তম কথা বলবে; সালাত কায়েম করবে ও যাকাত দেবে। তারপর তোমাদের অল্প কিছু লোক ছাড়া তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে, আর তোমরা ছিলে উপেক্ষাকারী। (৮৩) আর স্মরণ কর, যখন আমরা তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম: তোমরা একে অপরের রক্তপাত করবে না এবং একে অপরকে নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে বের করবে না। তারপর তোমরা তা স্বীকার করেছিলে, আর তোমরা তার সাক্ষী। (৮৪) তারপর তোমরাই সেই লোক, যারা একে অপরকে হত্যা করছ এবং তোমাদেরই একটি দলকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছ—পাপ ও সীমালঙ্ঘনের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে একে অপরকে সাহায্য করছ। আর তারা যদি বন্দি হয়ে তোমাদের কাছে আসে, তোমরা মুক্তিপণ দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে নাও—অথচ তাদের বের করে দেওয়াই তোমাদের জন্য হারাম ছিল। তবে কি তোমরা কিতাবের একাংশে বিশ্বাস কর আর একাংশ অস্বীকার কর? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে এমন করে, তার প্রতিদান দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ছাড়া আর কী? আর কিয়ামতের দিন তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তা সম্পর্কে উদাসীন নন। (৮৫) এরাই তারা, যারা আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবন কিনে নিয়েছে। সুতরাং তাদের শাস্তি লাঘব করা হবে না, আর তারা সাহায্যপ্রাপ্তও হবে না। (৮৬)

এই বিবরণের উদ্দেশ্য ও কোরআনের মর্মস্পর্শী ভাষা

সংক্ষেপে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, বনি ইসরাইল কারা। “ইসরাইল” হলো ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম)-এর উপাধি; তিনি ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর পৌত্র। ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর দুই পুত্র ইসমাইল ও ইসহাক—দুজনই নবী; ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-এর পুত্র ইয়াকুব, তিনিও নবী। তাঁর বারো সন্তানের বংশধর বারোটি গোত্র নিয়েই বনি ইসরাইল, যাদের আমরা সহজ ভাষায় ইহুদি বলি।

এত বিস্তারিত বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য তাদের নিন্দা করা নয়। ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে একটি সুন্দর কথা বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে আমাদেরকেই উদ্দেশ্য করছেন—কারণ যাদের কথা বলা হচ্ছে, তারা তো চলে গেছে। নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন: “তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতিনীতি হুবহু অনুসরণ করবে—বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে; এমনকি তারা যদি কোনো গুইসাপের গর্তেও প্রবেশ করে, তোমরাও তাতে প্রবেশ করবে।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, “ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা?” তিনি বললেন, “তবে আর কারা?” আজ ঠিক সেই ঘটনাগুলোই ঘটছে—বনি ইসরাইল শিরকে লিপ্ত হয়েছিল, আমরাও হচ্ছি; তারা কিতাবকে বিকৃত করেছিল, আর কিতাবের শব্দ বিকৃত করা সম্ভব না হলেও আমরা এর অর্থ বিকৃত করছি, অপব্যাখ্যা করছি। তাই এই বিবরণ পড়ার উদ্দেশ্য আমাদের সতর্ক হওয়া।

লক্ষণীয়, আল্লাহ তাআলা এই মর্মস্পর্শী ভাষায় বনি ইসরাইলকে সম্বোধন করেছেন তাদের এক নবীর নাম ও বংশ-সম্পর্ক স্মরণ করিয়ে, তাদের প্রতি অসংখ্য নিয়ামত স্মরণ করিয়ে—বারবার ক্ষমা, অলৌকিক অনুগ্রহ, কিতাব, নবী-রাসূল, জাগতিক রিজিক। বিশাল সব অপকর্মের বর্ণনা দিতে গিয়েও ভাষা এমন কোমল যে, কোনো ইহুদি আজ যদি হিদায়াতের সন্ধানে এই কিতাব পড়তে আসে, ভাষাটি তাকে আঘাত করবে না—বরং সে এখান থেকে পথ পেতে পারে। দাওয়াতে আক্রমণাত্মক হলে মানুষ দূরে সরে যায়; কোরআন সেই শিক্ষাই দেয়।

প্রথম অঙ্গীকার: তাওহীদ ও দ্বীনের মূলনীতি (৮৩)

“মিসাক” হলো এমন অঙ্গীকার, যা নিছক একবার নেওয়া হয়নি—বরং তাকিদ দিয়ে, বারবার স্মরণ করিয়ে, শপথ নিয়ে পাকাপোক্ত করা হয়েছে। আল্লাহ যখন নিজেকে বহুবচনে (“নিলাম”) উল্লেখ করেন, তা তাঁর কর্তৃত্ব ও মর্যাদা প্রকাশের জন্য—একাধিক সত্তা এখানে উদ্দেশ্য নয়, যা আরবি ভাষারীতিতে সুপরিচিত।

এই অঙ্গীকারের বিষয়বস্তু: এক, আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত না করা (তাওহীদ); দুই, মা-বাবার প্রতি এহসান; এরপর নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম ও অভাবীদের (মাসাকিন) প্রতি সদাচরণ; মানুষকে উত্তম কথা বলা; সালাত কায়েম ও যাকাত আদায়। এগুলো উসুলুদ্দিন—দ্বীনের মূলনীতি, যা সকল শরিয়তে অভিন্ন। মুসা, ঈসা ও মুহাম্মাদ (আলাইহিমুস সালাম)—প্রত্যেক নবীকে দেওয়া শরিয়তের মূলনীতি এক। কোনো শরিয়তেই আল্লাহ শিরকের অনুমতি দেননি, মা-বাবার সাথে দুর্ব্যবহার বা কারও প্রতি জুলুম বৈধ করেননি, কিংবা ইয়াতিম-মিসকিনের দেখাশোনা রহিত করেননি। খুঁটিনাটিতে পার্থক্য থাকতে পারে—যেমন কিবলা; পূর্ববর্তীরা হয়তো বাইতুল মাকদিসের দিকে সালাত পড়ত, আর নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-ও কিছুকাল সেদিকে পড়ার পর মক্কার দিকে ফিরতে আদিষ্ট হন—কিন্তু মূল বিধানগুলো অভিন্ন।

মা-বাবার প্রতি সদাচরণ: ভাষার তিনটি ইঙ্গিত

“ওয়া বিল ওয়ালিদাইনি ইহসানা”—এই সংক্ষিপ্ত বাক্যেই আল্লাহ মা-বাবার প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব ও ধরন—দুই-ই ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রথমত, স্বাভাবিক গঠন হতো “ইহসানান বিল ওয়ালিদাইন”; কিন্তু “বিল ওয়ালিদাইন” (মা-বাবা) আগে এনে তাঁদের মর্যাদা ও এহসানের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, সবচেয়ে বড় হক আল্লাহর হক—তাওহীদ, যেখানে ইবাদতের সামান্যতম অংশও (সালাত, সিজদা, দোয়া, চূড়ান্ত ভালোবাসা, তাওয়াক্কুল, আশা ও ভয়) আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও—কবর, মাজার, পীর, দরবেশ, জ্যোতিষী, গাছ-পাথর, এমনকি কোনো ফেরেশতা বা নবীর—জন্য দেওয়া যাবে না; এই সর্বোচ্চ হকের ঠিক পরপরই আল্লাহ মা-বাবার হক উল্লেখ করেছেন, যা তাঁদের অধিকারের বিশালত্ব বোঝায়। তৃতীয়ত, সাধারণত এহসানের সাথে “ইলা” আসে (আহসিনু ইলাল ওয়ালিদাইন); কিন্তু এখানে “বা” (بـ) এসেছে, যা ইঙ্গিত করে একটি ঊহ্য ক্রিয়া “বির” (আল-বির)। এহসান ও বির-এর মধ্যে পার্থক্য আছে: বির-এ ফোকাস থাকে সেই ব্যক্তির ওপর যাঁর প্রতি সদাচরণ করা হচ্ছে। যেমন কাউকে মাসে মাসে বিকাশে সাহায্য পাঠানো এহসান বটে, কিন্তু তাঁর সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, খোঁজখবর, সম্মান ও সাহচর্য না থাকলে তা “বির” নয়। বির হলো আর্থিক ও জাগতিক উপকারের সাথে সম্মান ও সদাচরণের সমন্বয়। তাই মা-বাবার প্রতি করণীয় কেবল টাকাপয়সা নয়—সেবা-যত্ন, সুন্দরতম আচরণ, এবং সামান্যতম বিরক্তিও প্রকাশ না করা।

এই আদব সন্তানদের ধরে ধরে শেখাতে হবে; আপনা-আপনি তারা শিখে যাবে—এমন ভাবা ভুল। এমনকি সন্তানকে শেখানো উচিত: “আমি মানুষ, আমার দ্বারা তোমার কষ্ট হতে পারে, আমি এমন কথাও বলতে পারি যা ভুল বা শরিয়তবিরোধী—সে ক্ষেত্রে আমার আদেশ মানতে তুমি বাধ্য নও, বরং তা জায়েজও নয়; কিন্তু বিরক্তি প্রকাশ করা যাবে না, এমনকি মুখটাও যেন মলিন না হয়।”

সৃষ্টির আনুগত্য শর্তসাপেক্ষ

মনে রাখতে হবে, সৃষ্টির আনুগত্য সবসময় শর্তসাপেক্ষ—এমনকি জাগতিক বিষয়ে নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দও অবশ্যপালনীয় নয়। বারিরা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) নামের এক দাসী মুক্ত হয়ে যাওয়ার পর তাঁর স্বামী মুগিস তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন, কিন্তু তিনি স্বামীকে সহ্য করতে পারতেন না। মুক্ত হওয়ায় সেই বিবাহে থাকা তাঁর জন্য বাধ্যতামূলক ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুগিসের ভালোবাসা দেখে বারিরাকে বিবাহবন্ধনে থেকে যাওয়ার অনুরোধ করলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “এটি কি আপনার আদেশ?” তিনি বললেন, “না, এটি আমার পরামর্শ মাত্র।” তখন বারিরা জানালেন যে স্বামীকে তাঁর প্রয়োজন নেই। এখান থেকেই বোঝা যায়, জাগতিক বিষয়ে নবীজির নিছক পছন্দ পর্যন্ত মানতে সবাই বাধ্য নয়। তাই মা-বাবা, স্বামী কিংবা যেকোনো কর্তৃপক্ষের আনুগত্য “মুকাইয়াদ” তথা শর্তসাপেক্ষ: উত্তম ও ন্যায়সঙ্গত বিষয়ে আনুগত্য করতে হবে, কিন্তু শরিয়তবিরোধী, অযৌক্তিক, বা কারও ওপর জুলুমমূলক আদেশ পালনে কেউ বাধ্য নয়। এর সাথে সাথে মা-বাবার প্রতি সর্বোচ্চ আদব রক্ষা, তাঁদের জন্য দোয়া, এবং মৃত্যুর পর তাঁদের প্রিয়জনদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা করণীয়।

কেউ যদি সঠিক কাজ করার পরও মা-বাবা চিৎকার করেন, তবু চিৎকার-ঝগড়া অবশ্যই এড়িয়ে ধৈর্য ধরতে হবে; আর তাঁদের ন্যায়সঙ্গত আদেশ পালন করতে হবে। এই বিষয়ে অনেকের বিভ্রান্তি আছে, তাই স্পষ্ট থাকা জরুরি।

“মানুষকে উত্তম কথা বলো”

“কুলু লিন্নাসি হুসনা”—এই আয়াতটি সাহাবিদের তাফসিরের আলোকে না বুঝলে অনেকে উল্টো বোঝে। মুফাসসিরগণ বলেছেন, “উত্তম কথা” মানে যার বিষয়বস্তুও ভালো, বলার ধরনও ভালো। তাওহিদের দিকে ডাকা উত্তম কথা; কিন্তু কাউকে ধমকে, গালমন্দ করে বা আক্রমণাত্মকভাবে বললে ধরনটি ভালো হলো না। তাই বিষয়বস্তু ও ধরন—দুটোই লাগবে। ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু), হাসান বাসরি (রাহিমাহুল্লাহ) প্রমুখ সালাফ বলেছেন, মানুষকে উত্তম কথা বলার অন্যতম অর্থ সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ; আর সর্বোত্তম উত্তম কথা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর দিকে আহ্বান—কারণ আল্লাহর দিকে ডাকার চেয়ে উত্তম কথা আর কী হতে পারে? কেউ কেউ বলেছেন, বনি ইসরাইলকে যেহেতু সম্বোধন, এর একটি অর্থ—শেষ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে সত্য বলা ও তাঁর আগমনের লক্ষণ গোপন না করা।

দুঃখজনকভাবে আজ বাস্তবতা এই যে, খুব নরমভাবে সৎ কাজের নসিহত করলেও অনেকে তা “বেয়াদবি” মনে করে—”তুমি আমাকে শেখাতে এসেছ?” অথচ বিনয়ের সাথে হাসিমুখে সত্য বলা কোরআনের সংজ্ঞায়ই উত্তম কথা।

মুখ ফিরিয়ে নেওয়া: দুটি শব্দ, দুটি ব্যাখ্যা (৮৩-এর শেষাংশ)

“সুম্মা তাওয়াল্লাইতুম… ওয়া আন্তুম মুরিদূন”—এখানে কাছাকাছি অর্থের দুটি শব্দ (“তাওয়াল্লি” ও “ইরাদ”) পাশাপাশি এসেছে। কোরআনে একই বাক্যে দুটি প্রতিশব্দ পাশাপাশি এলে তাদের অর্থ কখনো হুবহু এক হয় না। আলিমগণ দুই ধরনের ব্যাখ্যা করেছেন। এক, “তাওয়াল্লি” (মুখ ফিরিয়ে নেওয়া) বাহ্যিক—অর্থাৎ আদেশ পালন না করা; আর “ইরাদ” অন্তরের—অবজ্ঞা বা অপছন্দের অনুভূতি। এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে: প্রতিটি গুনাহে অন্তরে অবজ্ঞা থাকে না। আমরা গুনাহ করি, তারপর অনুশোচনা হয়, নিজেকে দোষী মনে করি, শোধরানোর পথ খুঁজি—এটি অবজ্ঞা নয়। কিন্তু কেউ যদি বাহ্যিক ইবাদত পুরোপুরি পরিত্যাগ করে এবং অন্তরে তুচ্ছতাচ্ছিল্য, অপছন্দ বা ঘৃণা নিয়ে তা করে—তা অত্যন্ত মারাত্মক। দুই, “মুরিদূন” এখানে ইসমু ফাইল (কর্তা)—ক্রিয়া নয়। কোনো বৈশিষ্ট্যকে কর্তা-রূপে প্রকাশ করলে তা স্থায়ী স্বভাব বোঝায়। যেমন “ইউসাল্লি” বললে বোঝায় সে এখন সালাত পড়ছে; কিন্তু “মুসাল্লি” (সালাত-আদায়কারী) বললে বোঝায় নিয়মিত সালাত আদায় তার স্থায়ী অভ্যাস। তেমনি “মুরিদূন”—মুখ ফিরিয়ে নেওয়াটাই তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।

দ্বিতীয় অঙ্গীকার: রক্তপাত ও বিতাড়ন নিষেধ (৮৪–৮৫)

দ্বিতীয় অঙ্গীকার—”তোমরা একে অপরের রক্তপাত করবে না ও একে অপরকে ঘরছাড়া করবে না।” “দিমা” হলো “দাম” (রক্ত)-এর বহুবচন; একটি জনগোষ্ঠীকে সম্বোধন হওয়ায় বহুবচন। “নিজেদের রক্তপাত”/”নিজেদের বের করা” মানে পরস্পরকে হত্যা বা বিতাড়ন। তারা এ অঙ্গীকার শুধু স্বীকারই করেনি, এর সত্যতার সাক্ষীও ছিল—পূর্ববর্তী প্রজন্মও তা জানত ও মানত।

এই আয়াতগুলোর একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। নবীজির সময় মদিনায় ইহুদিদের তিনটি গোত্র বাস করত—বানু কায়নুকা, বানু নাযির ও বানু কুরায়যা; তারা ছিল আহলে কিতাব। আর মদিনার আরব অধিবাসীরা দুই বড় গোত্রে বিভক্ত ছিল—আউস ও খাযরাজ, যারা মূর্তিপূজারি ও আখিরাত-অবিশ্বাসী ছিল এবং নানা উপলক্ষে পরস্পর যুদ্ধ করত। ইহুদিরা কিতাবের জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তাদের হিদায়াতের চেষ্টা তো করেইনি, বরং নিজেরাও দুই পক্ষে বিভক্ত হয়ে এই যুদ্ধে অংশ নিত। ফলে ইহুদি এক দল আরেক দলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যেত—একে অপরকে হত্যা করত, ঘরছাড়া করত। অথচ পরে বন্দিরা তাদের কাছে এলে “আমরা তো তাওরাত মানি” এই যুক্তিতে মুক্তিপণ দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে আনত। অর্থাৎ, হত্যা ও বিতাড়নের সময় তাওরাতের বিধান খেয়াল থাকত না, কিন্তু মুক্তিপণের বেলায় তাওরাতের দোহাই দিত—এই দ্বিমুখিতাই ছিল কিতাবের একাংশ মানা ও আরেক অংশ অস্বীকার করা।

খণ্ডিত আনুগত্যের পরিণাম (৮৫–৮৬)

তাই আল্লাহ প্রশ্ন করছেন: “তবে কি তোমরা কিতাবের একাংশে বিশ্বাস কর আর একাংশ অস্বীকার কর?” এই খণ্ডিত আনুগত্যের প্রতিদান—দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান (অগ্রিম শাস্তি), আর কিয়ামতের দিন কঠিনতম শাস্তির দিকে প্রত্যাবর্তন। “আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তা সম্পর্কে উদাসীন নন।” এরাই তারা, যারা আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবন কিনে নিয়েছে; তাদের শাস্তি লাঘব করা হবে না, তারা সাহায্যপ্রাপ্তও হবে না।

এই আয়াতের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োগ আমাদের নিজেদের ওপর। মুসলিমরাও আজ নানা দলে ও গোত্রে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন কারণে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে—জুলুম, বিতাড়ন, রক্তপাতে লিপ্ত হচ্ছে; আবার শরিয়তের ততটুকুই মানছি, যতটুকু আমাদের অনুকূল ও সুবিধাজনক। যেই আদেশে অসুবিধা দেখি, তা মানতে চাই না, এমনকি সে সম্পর্কিত কোরআন-হাদিসের কথা শুনতেও চাই না। নিজেকে আল্লাহকে ফাঁকি দেওয়া যায় না; কোরআন-হাদিসের আলোকে নিজেকে পরীক্ষা করলে আমরা দেখব, আমরাও যেন কিতাবের একাংশ মানছি আর একাংশ উপেক্ষা করছি—ঠিক বনি ইসরাইলের মতো। এ থেকে বাঁচাই আমাদের লক্ষ্য।

শিক্ষা

আল্লাহ-প্রদত্ত সকল শরিয়তের মূলনীতি অভিন্ন—তাওহীদ, মা-বাবার প্রতি সদাচরণ, আত্মীয়-ইয়াতিম-মিসকিনের দেখাশোনা, মানুষকে উত্তম কথা বলা ও সৎ কাজের আদেশ-মন্দ কাজে নিষেধ, সালাত ও যাকাত। খুঁটিনাটিতে পার্থক্য থাকলেও মূল ভিত্তি এক।

অঙ্গীকারের ক্রমই দেখিয়ে দেয়, তাওহীদই সর্বাগ্রে ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। আর আল্লাহর হকের ঠিক পরেই কোরআন যে মানবাধিকার উল্লেখ করে, তা মা-বাবার হক; তাঁদের প্রতি সদাচরণে আমাদের যত্নবান হতে হবে। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের সারকথা দুটি এহসানের সমন্বয়—আল্লাহর ইবাদতে এহসান, এবং সৃষ্টির প্রতি এহসান; আল্লাহর হক ও বান্দার হক মিলিয়েই দ্বীন।

সৃষ্টির আনুগত্য শর্তসাপেক্ষ—উত্তম ও ন্যায়সঙ্গত বিষয়ে; শরিয়তবিরোধী বা জুলুমমূলক আদেশে নয়। তবু মা-বাবার প্রতি সর্বোচ্চ আদব সর্বাবস্থায় রক্ষণীয়।

সবশেষে, এই আয়াতগুলোর সবচেয়ে সাধারণ ও কঠিন শিক্ষা: কিতাবের এক অংশ মানা আর আরেক অংশ অস্বীকার—এই খণ্ডিত আনুগত্যের পরিণাম দুনিয়ায় লাঞ্ছনা ও আখিরাতে কঠিন শাস্তি। আমাদের নিজেদের হিসাব আল্লাহর সাথে মিলিয়ে নিতে হবে, যেন আমরা কেবল সুবিধাজনক অংশটুকু বেছে নিয়ে বনি ইসরাইলের পথ না ধরি।