সূরা আল-বাকারা: আয়াত ২৬–২৯ — মশার দৃষ্টান্ত, অঙ্গীকার-ভঙ্গকারীদের পরিচয় ও পুনরুত্থানের নিদর্শন
আগের আয়াতে কুরআনের ঐশী উৎস নিয়ে যে আলোচনা এসেছিল, এই আয়াতগুলো তারই ধারাবাহিকতা। একদল অবিশ্বাসী আপত্তি তুলেছিল—কুরআন যদি আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়, তবে এতে মশা বা মাছির মতো তুচ্ছ প্রাণীর উল্লেখ কেন? এই আপত্তির জবাবেই আল্লাহ বলছেন, তিনি কোনো দৃষ্টান্ত দিতে লজ্জা করেন না; এর দ্বারা তিনি অনেককে পথ দেখান আর অনেককে (ফাসিকদের) পথভ্রষ্ট করেন। এরপর সেই ফাসিকদের পরিচয় দেওয়া হয়েছে—যারা আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, সম্পর্ক ছিন্ন করে ও জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করে। তারপর সমগ্র মানবজাতিকে সম্বোধন করে আল্লাহ প্রশ্ন করছেন—জীবন-মৃত্যু-পুনরুত্থান ও সৃষ্টির এত নিদর্শন সত্ত্বেও তোমরা কীভাবে তাঁকে অস্বীকার করো?
إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَسْتَحْىِۦٓ أَن يَضْرِبَ مَثَلًا مَّا بَعُوضَةً فَمَا فَوْقَهَا ۚ فَأَمَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ فَيَعْلَمُونَ أَنَّهُ ٱلْحَقُّ مِن رَّبِّهِمْ ۖ وَأَمَّا ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ فَيَقُولُونَ مَاذَآ أَرَادَ ٱللَّهُ بِهَٰذَا مَثَلًا ۘ يُضِلُّ بِهِۦ كَثِيرًا وَيَهْدِى بِهِۦ كَثِيرًا ۚ وَمَا يُضِلُّ بِهِۦٓ إِلَّا ٱلْفَٰسِقِينَ ٱلَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ ٱللَّهِ مِنۢ بَعْدِ مِيثَٰقِهِۦ وَيَقْطَعُونَ مَآ أَمَرَ ٱللَّهُ بِهِۦٓ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِى ٱلْأَرْضِ ۚ أُو۟لَٰٓئِكَ هُمُ ٱلْخَٰسِرُونَ كَيْفَ تَكْفُرُونَ بِٱللَّهِ وَكُنتُمْ أَمْوَٰتًا فَأَحْيَٰكُمْ ۖ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ هُوَ ٱلَّذِى خَلَقَ لَكُم مَّا فِى ٱلْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ ٱسْتَوَىٰٓ إِلَى ٱلسَّمَآءِ فَسَوَّىٰهُنَّ سَبْعَ سَمَٰوَٰتٍ ۚ وَهُوَ بِكُلِّ شَىْءٍ عَلِيمٌ
অনুবাদ: নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দৃষ্টান্ত দিতে লজ্জা করেন না—তা মশা হোক বা তার চেয়েও (তুচ্ছ কিংবা বড়) কিছু। যারা ঈমান এনেছে, তারা জানে এটি তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য; আর যারা কুফর করেছে, তারা বলে, “আল্লাহ এই দৃষ্টান্ত দিয়ে কী চেয়েছেন?” এর দ্বারা তিনি অনেককে পথভ্রষ্ট করেন এবং অনেককে পথ দেখান; আর এর দ্বারা কেবল ফাসিকদেরই পথভ্রষ্ট করেন। (২৬) (ফাসিক তারাই) যারা আল্লাহর অঙ্গীকার তা দৃঢ় করার পর ভঙ্গ করে, আল্লাহ যা জুড়ে রাখতে আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে, এবং জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করে—এরাই ক্ষতিগ্রস্ত। (২৭) তোমরা কীভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করো, অথচ তোমরা প্রাণহীন ছিলে, তারপর তিনি তোমাদের জীবন দিলেন, এরপর তোমাদের মৃত্যু দেবেন, তারপর আবার জীবিত করবেন, অতঃপর তাঁরই দিকে তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে? (২৮) তিনিই সেই সত্তা, যিনি জমিনে যা কিছু আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন; এরপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করলেন এবং সেগুলোকে সুবিন্যস্ত করে সাত আকাশে পরিণত করলেন। আর তিনি সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত। (২৯)
আয়াতের সংযোগ ও দৃষ্টান্তের প্রসঙ্গ
কুরআন অধ্যয়নের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, প্রতিটি আয়াত সাধারণত পূর্ববর্তী আয়াতের সাথে সম্পর্কিত। কোন আয়াতের সাথে কোন আয়াতের, এমনকি কোন সূরার সাথে কোন সূরার সংযোগ—এ নিয়ে অনেক আলিম আলোচনা করেছেন; একে স্বতন্ত্র একটি শাস্ত্র (ইলমুল মুনাসাবাত) বলা হয়, আর এ বিষয়ে বিখ্যাত একটি তাফসির-গ্রন্থ হলো “নাযমুদ দুরার” (ইমাম বিকাঈর রচনা)। এই আয়াতের সংযোগটি স্পষ্ট: আগের আলোচনায় কুরআন যে আল্লাহর বাণী তার প্রমাণ এসেছে, আর এখানে সেই ধারাবাহিকতায় অবিশ্বাসীদের একটি আপত্তির জবাব দেওয়া হচ্ছে—তারা বলত, “কুরআন যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়, তবে এতে মাছি-মশার মতো তুচ্ছ জিনিসের উল্লেখ কেন?”
মশার দৃষ্টান্ত: হিদায়াত ও গোমরাহি (২৬)
আল্লাহ জবাব দিচ্ছেন—তিনি কোনো দৃষ্টান্ত দিতে লজ্জা করেন না, তা মশা হোক বা “তার চেয়েও” কিছু। “ফামা ফাওকাহা” (তার চেয়েও) নিয়ে দুটি ব্যাখ্যা: কেউ বলেছেন এর চেয়ে বড় কিছু, কেউ বলেছেন তুচ্ছতায় এর চেয়েও ছোট কিছু; দুই অর্থেই অনুবাদ করা যায়। আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিতে দ্বিধা করেন না, কারণ মূল উদ্দেশ্য মানুষকে শেখানো ও পথ দেখানো—তিনি আমাদের কল্যাণকামী উপদেষ্টা। তাই প্রয়োজনে যত ক্ষুদ্র সৃষ্টিই হোক, তার দৃষ্টান্ত দিতে বাধা নেই।
এতে দুই রকম প্রতিক্রিয়া হয়। মুমিনরা জানে এটি তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য; আর অবিশ্বাসীরা বলে, “আল্লাহ এই দৃষ্টান্ত দিয়ে কী চাইলেন?”—অর্থাৎ ইঙ্গিত করে যে এটি যেন আল্লাহর নয়। এরপর আল্লাহ বলেন, “এর দ্বারা তিনি অনেককে পথভ্রষ্ট করেন এবং অনেককে পথ দেখান।” স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে—আল্লাহ যদি পথভ্রষ্ট করেন, তবে তাদের দোষ কী? আল্লাহ নিজেই জবাব দিয়েছেন: “আর এর দ্বারা কেবল ফাসিকদেরই পথভ্রষ্ট করেন।” অর্থাৎ এই গোমরাহি তাদের অবাধ্যতার শাস্তি; যে অন্তরে অবাধ্যতার প্রবণতা নিয়ে কুরআনের কাছে আসে, সে কুরআন দিয়েই বিভ্রান্ত হয়, আর যে সত্য চায়, সে পথ পায়।
মশা কিংবা মাছির মতো ক্ষুদ্র সৃষ্টির দৃষ্টান্ত প্রকৃতপক্ষে স্রষ্টার কুদরত ও তাওহিদের নিদর্শন। আল্লাহ অন্যত্র চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন—”আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের ডাকো, তারা একত্র হলেও একটি মাছি সৃষ্টি করতে পারবে না” (২২:৭৩)। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মেধাও একটি জীবন্ত মাছি সৃষ্টি করতে অক্ষম—এই ক্ষুদ্র সৃষ্টির নিখুঁত নকশাই স্রষ্টার প্রমাণ। তেমনি মাকড়সার জালের দৃষ্টান্তেও (২৯:৪১) দেখানো হয়েছে, মিথ্যা মাবুদরা যতই জাঁকালো দেখাক, প্রকৃতপক্ষে তারা মাকড়সার জালের মতোই দুর্বল—মানুষের ওপর তাদের কোনো ক্ষমতা নেই। সত্যান্বেষী এসব দৃষ্টান্তেই হিদায়াত পায়, আর ফাসিক তার অবাধ্যতার কারণেই বিভ্রান্ত হয়।
অঙ্গীকার-ভঙ্গকারী ফাসিকদের পরিচয় (২৭)
এবার সেই ফাসিকদের পরিচয়। প্রথম বৈশিষ্ট্য—তারা আল্লাহর “অঙ্গীকার” (আহদ) তা দৃঢ় করার পর ভঙ্গ করে। “আহদ” শব্দটি কুরআন বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ; আরবিতে এর কয়েকটি অর্থ—আদেশ, ওয়াসিয়্যাত (দৃঢ়ভাবে তাগিদকৃত আদেশ), শপথ, প্রতিশ্রুতি, এবং “সুবিদিত ও স্মরণীয় বিষয়” (মাহুদ)। এই শেষ অর্থটিই এখানে মূল—দুই পক্ষের মধ্যকার এমন এক বোঝাপড়া, যা সুপরিচিত এবং বারবার স্মরণ ও রক্ষা করা কর্তব্য।
“আল্লাহর আহদ” এখানে কী—এ নিয়ে মুফাসসিরগণ নানা মত দিয়েছেন (ইমাম কুরতুবি পাঁচটি, আবু হাইয়ান তাঁর “আল-বাহরুল মুহিত”-এ নয়টি মত উল্লেখ করেছেন; সংক্ষেপে ছয়টি গ্রহণযোগ্য মত): এক, আদি অঙ্গীকার (মিসাক)—দুনিয়ায় আসার আগে আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সন্তানদের কাছ থেকে নেওয়া অঙ্গীকার (৭:১৭২): “আমি কি তোমাদের রব নই?” তারা বলেছিল, “হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম”; ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সমস্ত বংশধরকে ক্ষুদ্র পিঁপড়ার মতো বের করে এই অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। দুই, নবীদের কাছ থেকে নেওয়া অঙ্গীকার—শেষ নবীর প্রতি ঈমান ও তাঁকে সাহায্য করার (৩:৮১); মুসা (আলাইহিস সালাম) ইহুদিদের থেকে, ঈসা (আলাইহিস সালাম) খ্রিষ্টানদের থেকে এই অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, আর তাদের আলিমরা তা জানত। তিন, শেষ নবীর প্রতি ঈমান ও আনুগত্যের অঙ্গীকার (দ্বিতীয় মতের শাখা)। চার, ওহির মাধ্যমে অবতীর্ণ সমস্ত আদেশ-নিষেধ—কুরতুবির মতে এটিই সবচেয়ে ব্যাপক, যা বাকি সব মতকে অন্তর্ভুক্ত করে। পাঁচ, কুরআনের সীমারেখা (চতুর্থ মতের একটি রূপ)। ছয়, মানুষের বিবেক ও সৃষ্টির নিদর্শন—কিছুটা দূরবর্তী হলেও সম্ভব অর্থ, কারণ এগুলোও “জেনে ও স্মরণে রাখার মতো” এক অঙ্গীকার।
মতগুলো একত্র করলে অঙ্গীকারকে চারটি স্তরে দেখা যায়: আদি অঙ্গীকার; ফিতরাতে গেঁথে দেওয়া তাওহিদের বোধ; বিবেক ও সৃষ্টির নিদর্শন; এবং যুগে যুগে নবী-রাসূল ও কিতাবের মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। এটিই আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি। তাই যে আল্লাহর ইবাদত অস্বীকার করে, কিংবা কোনো নবী বা কিতাবকে অস্বীকার করে, সে এই অঙ্গীকার ভঙ্গ করে—এমনকি একজন নবীকে অস্বীকার করলেও (যেমন সব নবীকে মেনে কেবল মুহাম্মাদ ﷺ-কে, অথবা ঈসা ও মুহাম্মাদ ﷺ-কে অস্বীকার) অঙ্গীকার ভঙ্গ হয়।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য—”আল্লাহ যা জুড়ে রাখতে আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করা।” এর দুটি ব্যাখ্যা: এক, আত্মীয়তার সম্পর্ক (রক্তের বন্ধন) ছিন্ন করা—যা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ ও ফাসিকদের বৈশিষ্ট্য; দুই, নবী-রাসূলদের সংযুক্ত ঈমানের ধারা ছিন্ন করা—অর্থাৎ কুরআনে বর্ণিত সব নবী-রাসূলের মধ্যে পার্থক্য না করে সকলকে বিশ্বাস না করা (২:২৮৫)। দুটোই গ্রহণযোগ্য। লক্ষণীয়, আমরা প্রায়ই ভাবি কুরআনের আয়াত অন্যদের—কাফির, মুনাফিক—উদ্দেশ্যে, আমাদের নয়। অথচ আল্লাহ এখানে দেখাচ্ছেন, আত্মীয়তা ছিন্ন করা পথভ্রষ্টদের বৈশিষ্ট্য; তাই যারা আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি, তাদের এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য—”জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করা।” “ফাসাদ”-এর অর্থ ব্যাপক: কুফর, অবাধ্যতা, নিফাক, জুলুম, রক্তপাত, মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, মানুষকে হিদায়াত থেকে বাধা দেওয়া—এসবই এর অন্তর্ভুক্ত। এই তিন বৈশিষ্ট্যের অধিকারীরাই “খাসিরুন”—ক্ষতিগ্রস্ত; যেমন ব্যবসায় মূলধন হারানোকে ক্ষতি বলে, তেমনি তারা সব হারিয়েছে।
“কীভাবে তোমরা আল্লাহকে অস্বীকার করো?” (২৮)
এরপর আল্লাহ প্রশ্ন করছেন: “তোমরা কীভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করো, অথচ তোমরা প্রাণহীন ছিলে?” এখানে চারটি স্তর: এক, তোমরা “মৃত” (আমওয়াত) ছিলে—অর্থাৎ সৃষ্টির আগে অস্তিত্বহীন ছিলে; দুই, তিনি তোমাদের জীবন দিলেন; তিন, তিনি তোমাদের মৃত্যু দেবেন; চার, আবার জীবিত করবেন, অতঃপর তাঁরই দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। একটু ভেবে দেখলে বিস্ময় জাগে—পঞ্চাশ বছর আগে আমার কোনো অস্তিত্বই ছিল না; আজ আমি চলছি, কথা বলছি, বিশাল জগৎ দেখছি, কত শব্দ শুনছি, কত স্বাদ-ঘ্রাণ অনুভব করছি—এই নিদর্শন ও নিজের নিঃস্বতা নিয়ে সামান্য ভাবলেই আল্লাহকে অস্বীকার করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। প্রথম তিনটি বিষয়ে আমরা নিশ্চিত (অস্তিত্বহীনতা, জীবন, মৃত্যু—চারপাশে মানুষকে মরতে দেখি); কেবল চতুর্থটি—পুনরুত্থান—আমরা দেখিনি, তাই পরের আয়াতে আল্লাহ তার নিদর্শন দিচ্ছেন।
সৃষ্টির নিদর্শন: সাত আকাশ (২৯)
“তিনিই জমিনে যা কিছু আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন; এরপর আকাশের দিকে মনোনিবেশ করলেন এবং সাত আকাশে সুবিন্যস্ত করলেন।” এখানে “ইসতাওয়া ইলাস সামা”—”ইসতাওয়া” সাধারণত “আলা” (উপরে) অব্যয়ের সাথে আসে, কিন্তু এখানে এসেছে “ইলা” অব্যয়ের সাথে, যা “তাদমিন” নির্দেশ করে (একটি ক্রিয়ায় অতিরিক্ত অর্থের অন্তর্ভুক্তি)। এখানে অর্থ “কাসাদা”—অর্থাৎ তিনি আকাশ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সেদিকে মনোনিবেশ করলেন। “ফাসাওয়াহুন্না সাবআ সামাওয়াত”—”সাওয়া” অর্থ কোনো কিছুকে নিখুঁতভাবে বিন্যস্ত ও সুষম করা; তিনি আকাশকে নিখুঁতভাবে সাজিয়ে সাত আকাশে পরিণত করলেন। “ওয়া হুয়া বিকুল্লি শাইয়িন আলিম”—তিনি সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।
শিক্ষা
আল্লাহ প্রয়োজনে যত ক্ষুদ্র সৃষ্টিরই দৃষ্টান্ত দিতে দ্বিধা করেন না, কারণ উদ্দেশ্য শিক্ষা দেওয়া। একই দৃষ্টান্তে মুমিন হিদায়াত পায় আর ফাসিক বিভ্রান্ত হয়—আল্লাহর গোমরাহ করা অকারণ নয়, তা অবাধ্যতার পরিণাম। তাই কুরআনের কাছে আসতে হবে সত্যান্বেষী ও অনুগত অন্তরে, অবাধ্যতার প্রবণতা নিয়ে নয়।
ফাসিকদের তিন বৈশিষ্ট্য—অঙ্গীকার ভঙ্গ, সম্পর্ক ছিন্ন ও ফাসাদ সৃষ্টি—আমাদের নিজেদের ক্ষেত্রেও যাচাই করা দরকার; বিশেষত আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা পথভ্রষ্টদের লক্ষণ বলে আল্লাহ সতর্ক করেছেন। আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি সেই বহুস্তরবিশিষ্ট অঙ্গীকার—আদি অঙ্গীকার, ফিতরাত, বিবেক ও সৃষ্টির নিদর্শন, এবং নবী-কিতাবের স্মরণ—যা রক্ষা করা কর্তব্য।
সবশেষে, জীবন-মৃত্যু-পুনরুত্থানের ধারা ও সৃষ্টির নিদর্শন—জমিনের সবকিছু আমাদের জন্য সৃষ্টি এবং সুবিন্যস্ত সাত আকাশ—আল্লাহকে অস্বীকারের কোনো অবকাশই রাখে না। যিনি অস্তিত্বহীন থেকে আমাদের জীবন দিয়েছেন, তিনিই মৃত্যুর পর আবার জীবিত করতে সক্ষম; আর তিনি সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।