সূরা আল-বাকারা: আয়াত ৩০–৩৩ — আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সৃষ্টি, খলিফা ও জ্ঞানের মর্যাদা
মানুষের শ্রেণিবিভাগ, ইবাদতের (তাওহিদের) আদেশ এবং নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পথে সেই ইবাদত পালনের নির্দেশ ও সৃষ্টির নিদর্শন বর্ণনার পর কুরআন এবার প্রথম মানুষ সৃষ্টির অপূর্ব ঘটনার দিকে ফিরছে—যা নিছক তথ্যমূলক ইতিহাস নয়, বরং শিক্ষণীয় এক ঘটনা। এই ঘটনায় একদিকে যেমন আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিহিত, তেমনি এতেই জড়িয়ে আছে আদম (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর সন্তানদের সবচেয়ে বড় শত্রু ইবলিসের ইতিহাস। এই শত্রু থেকে বাঁচার একমাত্র আশ্রয় আল্লাহ; জিনকে বন্ধু বানানোর চেষ্টা—যেমন জ্যোতিষী, গণক বা জাদুকরের দ্বারস্থ হওয়া—প্রকৃতপক্ষে শয়তানের ইবাদত ও শিরকের পথ, যা দুনিয়া-আখিরাত দুই-ই নষ্ট করে। এই অংশে আসছে খলিফা সৃষ্টির ঘোষণা, ফেরেশতাদের প্রশ্ন, আদমকে নাম শেখানো ও ফেরেশতাদের স্বীকৃতি—যার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় জ্ঞানের মর্যাদা।
وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَٰٓئِكَةِ إِنِّى جَاعِلٌ فِى ٱلْأَرْضِ خَلِيفَةً ۖ قَالُوٓا۟ أَتَجْعَلُ فِيهَا مَن يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ ٱلدِّمَآءَ وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ ۖ قَالَ إِنِّىٓ أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ وَعَلَّمَ ءَادَمَ ٱلْأَسْمَآءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى ٱلْمَلَٰٓئِكَةِ فَقَالَ أَنۢبِـُٔونِى بِأَسْمَآءِ هَٰٓؤُلَآءِ إِن كُنتُمْ صَٰدِقِينَ قَالُوا۟ سُبْحَٰنَكَ لَا عِلْمَ لَنَآ إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَآ ۖ إِنَّكَ أَنتَ ٱلْعَلِيمُ ٱلْحَكِيمُ قَالَ يَٰٓـَٔادَمُ أَنۢبِئْهُم بِأَسْمَآئِهِمْ ۖ فَلَمَّآ أَنۢبَأَهُم بِأَسْمَآئِهِمْ قَالَ أَلَمْ أَقُل لَّكُمْ إِنِّىٓ أَعْلَمُ غَيْبَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ وَأَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا كُنتُمْ تَكْتُمُونَ
অনুবাদ: আর স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন, “নিশ্চয়ই আমি জমিনে একজন খলিফা সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।” তারা বলল, “আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে সেখানে ফাসাদ করবে ও রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা আপনার প্রশংসাসহ আপনার তাসবিহ পাঠ করি এবং আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করি।” তিনি বললেন, “নিশ্চয়ই আমি এমন কিছু জানি, যা তোমরা জানো না।” (৩০) আর তিনি আদমকে সকল বস্তুর নাম শেখালেন; তারপর সেগুলো ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করে বললেন, “তোমরা সত্যবাদী হলে এদের নাম আমাকে বলে দাও।” (৩১) তারা বলল, “আপনি পরম পবিত্র! আপনি আমাদের যা শিখিয়েছেন, তা ছাড়া আমাদের কোনো জ্ঞান নেই। নিশ্চয়ই আপনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (৩২) তিনি বললেন, “হে আদম, তুমি তাদের এদের নাম বলে দাও।” অতঃপর যখন সে তাদের এদের নাম বলে দিল, তখন আল্লাহ বললেন, “আমি কি তোমাদের বলিনি যে, নিশ্চয়ই আমি আসমান ও জমিনের অদৃশ্য বিষয় জানি, আর তোমরা যা প্রকাশ করো এবং যা গোপন করো—সবই জানি?” (৩৩)
ইসরাঈলিয়াত: পড়ার আগে কয়েকটি মূলনীতি
আদম (আলাইহিস সালাম) ও অতীত নবী-রাসূল ও তাদের জাতিদের ঘটনায় প্রাচীন ও আধুনিক তাফসিরে প্রায়ই “ইসরাঈলিয়াত” পাওয়া যায়—অর্থাৎ বনি ইসরাইল তথা ইহুদি-খ্রিষ্টান-আহলে কিতাব থেকে প্রাপ্ত বিবরণ। কুরআন ও হাদিস অনেক খুঁটিনাটি বাদ দিয়ে গেছে, কারণ সেসব আমাদের হিদায়াতের জন্য জরুরি নয় (যেমন শয়তান ঠিক কীভাবে আদমকে ওয়াসওয়াসা দিল, সাপের প্রসঙ্গ ইত্যাদি—এগুলোর কুরআন-হাদিসে কোনো ভিত্তি নেই)। কিন্তু মানুষের কৌতূহল মেটাতে সাহাবি (যেমন ইবনে আব্বাস, ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে শুরু করে পরবর্তীরা এসব বর্ণনা করেছেন; হাদিসেও এর অনুমতি আছে—”হাদ্দিসু আন বনি ইসরাইল ওয়া লা হারাজ” (বনি ইসরাইল সম্পর্কে বর্ণনা করতে দোষ নেই)।
তাই ক্লাসিক্যাল তাফসির পড়ার আগে কয়েকটি মূলনীতি মাথায় রাখা জরুরি। এক, এসব বর্ণনা নির্ভরযোগ্য নয়—এতে সত্য-মিথ্যা মিশে আছে; কুরআন-হাদিসের সাথে মিললে গ্রহণ, সাংঘর্ষিক হলে প্রত্যাখ্যান, আর মিলও নেই সংঘর্ষও নেই—এমন হলে “আল্লাহই ভালো জানেন।” দুই, বহিরাগত প্রমাণ ছাড়া এগুলোকে সত্য বা মিথ্যা বলা যাবে না, তবে বর্ণনা করা বৈধ। তিন, সাহাবিগণ এসব বর্ণনা করেছেন বলে তাঁদের প্রতি কোনো নেতিবাচক ধারণা করা যাবে না; বর্ণনা করা বৈধ ও ফলপ্রসূ। চার, এগুলোর ফায়দা হলো ঘটনার ফাঁক পূরণ করে সামগ্রিক উপলব্ধিতে সাহায্য করা। পাঁচ, সবচেয়ে বড় বিপদ—প্রতিটি খুঁটিনাটিকে সত্য মনে করে বসা; এটি কখনোই করা যাবে না। ইবনে কাসিরের মতো নির্ভরযোগ্য তাফসিরেও এই বর্ণনাগুলো আসে, তাই উৎস বুঝে পড়া দরকার, নইলে খটকা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
খলিফা: শব্দ ও কয়েকটি মত (৩০)
“ওয়া ইজ কালা রব্বুকা লিল মালাইকা”—এখানে “ইজ” (যখন) শব্দের সাথে একটি ঊহ্য “উজকুর” (স্মরণ করো/উল্লেখ করো) ধরা হয়: “হে নবী, স্মরণ করুন সেই সময়ের কথা, যখন আপনার রব ফেরেশতাদের বললেন।” বাক্যগঠনে দুটি মত—হয় “খলিফা” পর্যন্ত প্রথম বাক্য শেষ করে “কালু” (তারা বলল) দিয়ে নতুন বাক্য, নয়তো “ইজ”-কে “কালু”-র সাথে যুক্ত ধরা।
“খলিফা” শব্দের অর্থ—যে কারও স্থলাভিষিক্ত হয়, কারও পরে আসে, বা কারও প্রতিনিধিত্ব করে। এর অর্থ নিয়ে কয়েকটি মত: প্রথম, আদম তথা মানবজাতিকে খলিফা বলা হয়েছে কারণ তারা পূর্বে জমিনে বসবাসকারী জিন (বা সেখানে অবস্থানকারী ফেরেশতা)-দের স্থলাভিষিক্ত হবে; এই বর্ণনা—আগে জিনেরা জমিনে ফাসাদ করত, আল্লাহ ইবলিসের নেতৃত্বে ফেরেশতাদের একটি দল দিয়ে তাদের দমন করান ইত্যাদি—ইসরাঈলিয়াতনির্ভর, তাই উপরের মূলনীতি অনুযায়ী এটিকে নিশ্চিত সত্য ধরা যাবে না, তবে বর্ণনা করতে বাধা নেই। দ্বিতীয়, মানবজাতি একে অপরের স্থলাভিষিক্ত হবে—এক প্রজন্ম গিয়ে আরেক প্রজন্ম আসবে; এটি হাসান বসরি (রাহিমাহুল্লাহ)-র বক্তব্য (সনদ মুরসাল বলে শক্তিশালী নয়, তবে ইবনে কাসির একে প্রাধান্য দিয়েছেন), আর কুরআনে মানবজাতিকে “খালাইফ/খুলাফা” বলার আয়াতসমূহ (৬:১৬৫; ২৭:৬২) এর সমর্থক—এই মতটিই অগ্রাধিকারযোগ্য। তৃতীয়, আদম ও তাঁর সৎকর্মশীল বংশধরেরা বিচার-ফয়সালায় আল্লাহর প্রতিনিধি হয়ে তাঁর বিধান প্রতিষ্ঠা করবে; এটি ইমাম তাবারি (মৃ. ৩১০ হি.) সর্বপ্রথম উল্লেখ করেছেন (সালাফের বক্তব্যের সূত্রে) এবং ইমাম বাগাবি (মৃ. ৫১৬ হি.) একে প্রাধান্য দিয়েছেন—অর্থাৎ এটি একটি প্রাচীন মত, বর্তমান কোনো রাজনৈতিক দলের আবিষ্কার নয় (যদিও এই মত থেকে টানা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বিতর্কযোগ্য হতে পারে, তা ভিন্ন প্রসঙ্গ)। উল্লেখ্য, এখানে “খলিফা” রাষ্ট্রীয় খিলাফতের (যেমন খলিফাতুর রাসূল আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু) সীমিত অর্থে নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য অর্থে।
ফেরেশতাদের প্রশ্ন ও আল্লাহর জবাব (৩০)
ফেরেশতারা বলল, “আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে ফাসাদ করবে ও রক্তপাত ঘটাবে?” এটি আপত্তি নয়, বরং হিকমত জানতে চাওয়া—কারণ ফেরেশতাদের কাছে আল্লাহর অবাধ্যতা একটি অস্বাভাবিক ব্যাপার। তারা কীভাবে জানল যে মানুষ ফাসাদ ও রক্তপাত করবে? সবচেয়ে শক্তিশালী মত—আল্লাহই তাদের জানিয়েছেন (ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস, কাতাদা রাহিমাহুমুল্লাহ); কেউ বলেছেন পূর্ববর্তী জিনদের অবস্থার সাথে তুলনা করে ধারণা করেছেন (ইসরাঈলিয়াতনির্ভর); ইবনে কাসির বলেছেন সৃষ্টি-উপাদান (শুকনো মাটি) থেকে অনুমান করেছেন; আর খলিফার অর্থ যদি বিচার-প্রতিনিধিত্ব হয়, তবে বিচারের প্রয়োজনই ইঙ্গিত করে অপরাধ ঘটবে (কুরতুবি)।
“ওয়া নাহনু নুসাব্বিহু বিহামদিকা ওয়া নুকাদ্দিসু লাকা”—আমরা আপনার প্রশংসাসহ তাসবিহ পাঠ করি ও আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করি। “নুকাদ্দিস” অর্থ পবিত্রতা ঘোষণা; সালাফের একটি বড় অংশ এখানে “নুসাল্লি লাকা” (আপনার জন্য সালাত আদায় করি) অর্থ করেছেন, কেউ “তাজিম” (ভক্তি) অর্থ নিয়েছেন—সমন্বয় করে বলা যায়, সালাত ও ভক্তির মাধ্যমে পবিত্রতা ঘোষণা। জবাবে আল্লাহ বললেন, “নিশ্চয়ই আমি এমন কিছু জানি যা তোমরা জানো না।” এর অর্থ সাধারণভাবে—তোমরা সবকিছু জানো না; আবার সুনির্দিষ্টভাবে—ইবলিসের অন্তরে লুকানো অহংকার তোমরা জানো না (ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, ইসমাইল আস-সুদ্দি), অথবা এদের মধ্য থেকেই যে নবী-রাসূল ও সৎকর্মশীল লোক হবে তা আমি জানি (কাতাদা, মুকাতিল)।
আদমকে নাম শেখানো ও ফেরেশতাদের স্বীকৃতি (৩১–৩২)
“ওয়া আল্লামা আদামাল আসমাআ কুল্লাহা”—আল্লাহ আদমকে সকল বস্তুর নাম শেখালেন। সালাফের বক্তব্য অনুযায়ী—বস্তুর নাম, বৈশিষ্ট্য, ক্রিয়া-প্রক্রিয়া, শ্রেণিবিভাগ ও বিভাগ; কেউ বলেছেন মানুষ ও ফেরেশতাদের নির্দিষ্ট নামও; তবে অগ্রাধিকারযোগ্য মত—সবকিছুরই নাম। এরপর “আরাদাহুম আলাল মালাইকা”—সেগুলো ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন (“হুম” সর্বনাম এসেছে, কারণ বস্তুগুলোর মধ্যে বুদ্ধিমান সত্তাও ছিল, তাই বুদ্ধিমানের সর্বনাম ব্যবহৃত হয়েছে; এতে বোঝায় না যে কেবল মানুষ বা ফেরেশতাই ছিল)। তারপর বললেন, “আমাকে এদের নাম বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও”—অর্থাৎ (ঊহ্য দাবি) তোমরা যে অধিকতর জ্ঞানী বা সম্মানিত, সেই দাবিতে যদি সত্যবাদী হও।
ফেরেশতারা তখন স্বীকার করল, “সুবহানাকা লা ইলমা লানা ইল্লা মা আল্লামতানা”—আপনি পরম পবিত্র, আপনি যা শিখিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের কোনো জ্ঞান নেই; নিশ্চয়ই আপনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। উত্তর দিতে না পেরে তারা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করল—কারণ গায়েব একমাত্র আল্লাহই জানেন, আর আল্লাহ না শেখালে কারও কিছু জানার সাধ্য নেই।
“তোমরা যা প্রকাশ কর ও গোপন কর—সবই জানি” (৩৩)
এরপর আল্লাহ আদমকে বললেন, “হে আদম, তুমি তাদের এদের নাম বলে দাও।” আদম যখন তা বলে দিলেন, তখন আল্লাহ বললেন, “আমি কি তোমাদের বলিনি যে, আমি আসমান-জমিনের অদৃশ্য জানি, আর তোমরা যা প্রকাশ কর ও যা গোপন কর—সবই জানি?” “মা তুবদুন” (যা প্রকাশ কর) বলতে ফেরেশতাদের আনুগত্য ও তাদের প্রশ্ন, আর “মা কুনতুম তাকতুমুন” (যা গোপন করছিলে) বলতে দুটি ব্যাখ্যা: এক, ইবলিসের লুকানো অহংকার ও অবাধ্যতা; দুই, ফেরেশতাদের নিজেদের মধ্যকার সেই আলোচনা—আল্লাহ তাদের চেয়ে অধিক সম্মানিত বা জ্ঞানী কাউকে সৃষ্টি করবেন না (ইসরাঈলিয়াতে বর্ণিত)। “কুনতুম তাকতুমুন”-এ “কুনতুম” গোপন করার বিষয়টিকে জোরালো করে—অর্থাৎ যা তোমরা অতি যত্নে গোপন কর, তা-ও আমি জানি (এই ব্যাখ্যা ইবনে আশুরের তাফসিরে পাওয়া যায়); এ কারণেই অনুবাদে “সযত্নে গোপন কর” আসে।
জ্ঞানের মর্যাদা: মানুষ ও ফেরেশতা
মানুষ কি ফেরেশতাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ—এ প্রশ্নে কোনো কোনো আলিম বলেছেন এতে খুব বেশি খোঁড়াখুঁড়ির প্রয়োজন নেই, কারণ এটি অতিরিক্ত জ্ঞান, অপরিহার্য নয়। তবে ইবনে তাইমিয়া ও তাঁর ছাত্র ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুমাল্লাহ) এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। প্রশ্নটি আসে কারণ ফেরেশতারা নূরের তৈরি ও সর্বদা আল্লাহর অনুগত, আর মানুষ মাটির তৈরি, তার মধ্যে দুর্বলতা ও পাপের প্রতি টান আছে। ইবনে তাইমিয়া (মাজমুউল ফাতাওয়া, ১১তম খণ্ড) মোটামুটি বলেছেন—জ্ঞানের বিচারে আদম (আলাইহিস সালাম) ফেরেশতাদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হলেন; আর তাঁর সৎকর্মশীল বংশধরেরা (নবী-রাসূল ও অনুগত মুমিনরা) ফেরেশতাদের চেয়ে উত্তম—অবিশ্বাসীরা কখনোই নয়। তুলনাটি ব্যক্তি-বনাম-ব্যক্তি নয়, বরং শ্রেণি হিসেবে (সাধারণভাবে ফেরেশতা বনাম সাধারণভাবে সৎকর্মশীল মুমিন)। ইবনুল কাইয়িম (ইবনে তাইমিয়ার উদ্ধৃতিসহ) বলেছেন—প্রাথমিক অবস্থার বিচারে ফেরেশতারা উত্তম (কারণ মুমিন দুনিয়ায় সবসময় তার শ্রেষ্ঠ অবস্থায় থাকে না, পাপে জড়ায়), কিন্তু সৎকর্মশীল মুমিনরা জান্নাতে পৌঁছে পূর্ণতা লাভ করলে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশিত হবে—তখন ফেরেশতারা প্রতিটি দরজা দিয়ে প্রবেশ করে তাদের সালাম জানাবেন (১৩:২৩–২৪)। মূল শিক্ষা—জ্ঞানের মর্যাদা; আল্লাহ আদমের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেছেন তাঁকে জ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে, তাই আমাদেরও জ্ঞানের পথে চলতে হবে।
শিক্ষা
আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সৃষ্টির ইতিহাস নিছক তথ্য নয়; এতে আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু ইবলিসের পরিচয় জড়িত। এই শত্রু থেকে একমাত্র আশ্রয় আল্লাহ; জিন-শয়তানকে বন্ধু বানানোর চেষ্টা (জ্যোতিষী-গণক-জাদুকরের দ্বারস্থ হওয়া) শিরক ও ধ্বংসের পথ, আর তাওহিদই প্রকৃত প্রশান্তি ও নিরাপত্তা।
অতীত নবী-রাসূল ও জাতিদের ঘটনায় ইসরাঈলিয়াত পড়ার সময় মূলনীতি স্মরণ রাখা জরুরি—বর্ণনা করা বৈধ, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া সত্য-মিথ্যা নিশ্চিত করা যাবে না; কুরআন-হাদিসের সাথে মিললে গ্রহণ, সাংঘর্ষিক হলে প্রত্যাখ্যান; আর প্রতিটি খুঁটিনাটিকে সত্য মনে করা বিপজ্জনক।
ফেরেশতাদের প্রশ্ন ছিল হিকমত জানার জন্য, আপত্তির জন্য নয়; আর আল্লাহর জবাব—”আমি জানি যা তোমরা জানো না”—আমাদের শেখায় আল্লাহর জ্ঞানের সীমাহীনতা ও নিজেদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়া, ঠিক যেমন ফেরেশতারা বিনয়ে স্বীকার করেছিলেন। সবশেষে, আদমকে নাম শিখিয়ে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় জ্ঞানের মর্যাদা—যা অর্জনের পথেই আমাদের চলতে হবে।