সংশোধনের ছদ্মবেশে ফাসাদ: মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য (২:১১–১৬)
গত আলোচনায় মুনাফিকদের পরিচয় শুরু হয়েছিল। সূরা আল-বাকারার আট থেকে বিশ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন—মুত্তাকিদের জন্য পাঁচ আয়াত, কাফিরদের জন্য দুই আয়াত, আর মুনাফিকদের জন্য তেরো আয়াত। এই দীর্ঘ বর্ণনা প্রমাণ করে বিষয়টি কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। আলোচ্য আয়াতগুলোতে মুনাফিকদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠছে—তারা সংশোধনের দাবি করে অথচ ফাসাদ ছড়ায়, মুমিনদের নির্বোধ ভাবে, প্রকাশ্যে ঈমানের ঘোষণা দিয়ে গোপনে মুমিনদের নিয়ে উপহাস করে।
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلَٰكِن لَّا يَشْعُرُونَ وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا كَمَا آمَنَ النَّاسُ قَالُوا أَنُؤْمِنُ كَمَا آمَنَ السُّفَهَاءُ ۗ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ السُّفَهَاءُ وَلَٰكِن لَّا يَعْلَمُونَ وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَىٰ شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُونَ اللَّهُ يَسْتَهْزِئُ بِهِمْ وَيَمُدُّهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ أُولَٰئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الضَّلَالَةَ بِالْهُدَىٰ فَمَا رَبِحَت تِّجَارَتُهُمْ وَمَا كَانُوا مُهْتَدِينَ
আর যখন তাদের বলা হয়, তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ (অবাধ্যতা) সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে, আমরা তো কেবল সংশোধনকারী। শোনো, নিশ্চয়ই তারাই ফাসাদকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না। আর যখন তাদের বলা হয়, তোমরা ঈমান আনো যেভাবে মানুষ ঈমান এনেছে, তখন তারা বলে, আমরা কি ঈমান আনব যেভাবে নির্বোধরা ঈমান এনেছে? শোনো, নিশ্চয়ই তারাই নির্বোধ, কিন্তু তারা তা জানে না। আর যখন তারা মুমিনদের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি; আর যখন তারা নিভৃতে তাদের শয়তানদের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা তো তোমাদেরই সঙ্গে আছি, আমরা তো কেবল উপহাস করছিলাম। আল্লাহ তাদের সঙ্গে উপহাস করেন এবং তাদের অবকাশ দিয়ে তাদের অবাধ্যতায় বাড়তে দেন, তারা দিশেহারা হয়ে ঘুরপাক খায়। এরাই তারা, যারা হিদায়াতের বিনিময়ে ভ্রষ্টতা কিনেছে; তাই তাদের ব্যবসা লাভজনক হয়নি, আর তারা সৎপথপ্রাপ্তও ছিল না।
নিফাকের উদ্ভব ও আজকের প্রাসঙ্গিকতা
নিফাকের একটি পটভূমি জানা দরকার। মদিনায় যখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবিগণ আশ্রয় পেলেন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের ভিত্তি দৃঢ় হলো, তখনই নিফাকের উদ্ভব। কারণ এখন ইসলাম শক্তিশালী, তাই মুসলিম পরিচয় দিয়ে পার্থিব সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলো—মুসলিম সমাজে জান-মালের নিরাপত্তা, বিবাহ, উত্তরাধিকার ইত্যাদি। একদল লোক অন্তরে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পুষে, গোপনে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেও মুখে মুসলিম দাবি করতে লাগল। মক্কি যুগে—নবুওয়াতের প্রথম তেরো বছরে—মুসলিম পরিচয় দেওয়া মানে ছিল নির্যাতন ও ত্যাগের ঝুঁকি নেওয়া, তাই তখন কোনো মুনাফিক ছিল না।
কেউ ভাবতে পারেন মুনাফিক তো অতীতের এক নির্দিষ্ট গোষ্ঠী; আজ তাদের বৈশিষ্ট্য জেনে লাভ কী? কিন্তু আল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত তিলাওয়াতের জন্য এত আয়াত কেবল অতীতের একটি ছোট দলের নিন্দায় দেননি। সূরা আন-নিসা, আত-তাওবা, এমনকি “আল-মুনাফিকুন” নামে পৃথক সূরা—বারবার মুনাফিকদের প্রসঙ্গ এসেছে। কারণ আমাদের সমাজেও মুনাফিক আছে, আর সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের নিজেদের মধ্যে নিফাকের বৈশিষ্ট্য আসার ভয় করা জরুরি।
“ফাসাদ” শব্দের অর্থ
আয়াতের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ “লা তুফসিদু”—ফাসাদ সৃষ্টি করো না। বাংলায় “ফাসাদ” শুনলে সাধারণত সামাজিক বিশৃঙ্খলা, মারামারি জাতীয় সংকীর্ণ অর্থ মনে আসে; কিন্তু শরিয়তে “ফাসাদ”-এর অর্থ ব্যাপক। কুরআন বুঝতে হলে সর্বদা দুই ধরনের অর্থ মেলাতে হয়—ভাষাগত অর্থ ও শরিয়তের অর্থ; আর শরিয়তের অর্থ জানতে ভাষাবিদ ও সালাফের বক্তব্য দেখতে হয়। যেমন “সালাত”-এর ভাষাগত অর্থ দুআ, কিন্তু শরিয়তে তা একটি নির্দিষ্ট ইবাদত।
ভাষাগতভাবে ফাসাদ মানে কোনো বস্তুর যথাযথ, ভারসাম্যপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল অবস্থা থেকে পরিবর্তিত হওয়া—যেমন সুস্বাদু, উপকারী খাবার নষ্ট হয়ে বিস্বাদ ও ক্ষতিকর হয়ে যাওয়া। শরিয়তের অর্থে মুফাসসিরগণ ফাসাদকে কুফর ও গুনাহ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। ইবনু মাসউদ ও ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) থেকে বর্ণিত, এখানে ফাসাদ মানে কুফর ও মাসিয়াত। আবুল আলিয়া বলেছেন, আল্লাহর অবাধ্যতাই তাদের ফাসাদ ছিল—কেউ পৃথিবীতে আল্লাহর অবাধ্যতা করলে বা মানুষকে মন্দের দিকে ডাকলে সে ফাসাদ সৃষ্টি করে; কারণ আসমান-জমিনের কল্যাণ-শৃঙ্খলা টিকে থাকে আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে। মুজাহিদ—যিনি ইবনু আব্বাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাফসির-শিষ্য এবং যাঁর বর্ণনাসূত্র প্রায়ই অধিক নির্ভরযোগ্য—বলেছেন এখানে ফাসাদ মানে গুনাহ।
এখান থেকে বোঝা যায়, কেউ নিভৃতে গুনাহ করলেও তা ফাসাদ, যদিও বাহ্যত সে কারও ক্ষতি করছে না। কারণ, এক দিক থেকে, বান্দার যথাযথ অবস্থা হলো আল্লাহর আনুগত্যে থাকা; গুনাহ করলে সেই অবস্থা নষ্ট হয়। অন্য দিক থেকে, গুনাহই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণ—আল্লাহ বলেন, মানুষের কৃতকর্মের ফলে স্থলে ও সমুদ্রে ফাসাদ ছড়িয়ে পড়েছে, যেন তিনি তাদের কিছু কৃতকর্মের স্বাদ আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে (সূরা আর-রুম, ৩০:৪১)। এই দুর্যোগ পূর্ণ শাস্তি নয়, বরং সামান্য সতর্কীকরণ ও আল্লাহর রহমত। তাই কুফর, আল্লাহর অবাধ্যতা, নিফাক, যুলুম, রক্তপাত, ষড়যন্ত্র, মানুষকে দ্বীনের পথ থেকে বিরত রাখা—সবই ফাসাদের অন্তর্ভুক্ত। মানুষকে দ্বীনের পথ থেকে বিরত রাখা এক বড় ফাসাদ, আর তা কখনো পরিবারের ভেতরেও ঘটে—কেউ নিজের সন্তানকে দ্বীন পালনে বাধা দিলে সে-ও এই ফাসাদে জড়িত, যদিও সে নিজেকে মুসলিম দাবি করে।
“আমরা তো কেবল সংশোধনকারী”
ফাসাদ থেকে নিষেধ করা হলে তারা বলে, “আমরা তো কেবল সংশোধনকারী” (মুসলিহুন)। সালাফ থেকে “ইসলাহ”-এর দুটি অর্থ বর্ণিত। এক, দুই পক্ষের মধ্যে মীমাংসা করা—মদিনায় ইহুদিদের সঙ্গে চুক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা ইসলামের প্রতি বিদ্বেষী ছিল; মুনাফিকদের এই ঘনিষ্ঠতার কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলত, আমরা তো উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা করছি। দুই, মুজাহিদের ব্যাখ্যায়—”আমরা সৎপথে আছি, আমরা ভালো মানুষ।” এ ছাড়া তৃতীয় অর্থও সংগত—কোনো অস্বাভাবিক অবস্থা বা সমস্যা দূর করে যথাযথ অবস্থা ফিরিয়ে আনা।
এখানে মুনাফিকদের এক স্থায়ী কৌশল উন্মোচিত হয়: তারা সংশোধনকারী বা সমাজসেবীর পরিচয়ে আসে। যা দ্বীনের বিপরীত, তা-ও তারা উপস্থাপন করে আকর্ষণীয় নামে—”উন্নয়ন,” “ক্ষমতায়ন,” “অধিকার,” “সমঝোতা।” প্রকাশ্যে তারা দ্বীনের বিরুদ্ধে কিছু বলে না, বরং কুরআনের বর্ণনার সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে দেখানোর চেষ্টা করে; অথচ ভেতরে ভেতরে আল্লাহর নির্দেশের বিপরীত জিনিসকে “কল্যাণ” নাম দিয়ে চালায়। যেমন সুদকে “দারিদ্র্য বিমোচন” বা “সহায়তা”-র সুন্দর নামে উপস্থাপন করা—নাম যতই সুন্দর হোক, বস্তুত তা ফাসাদ। এটিই আয়াতের সর্বকালীন শিক্ষা: ফাসাদ প্রায়ই সংশোধনের ছদ্মবেশে আসে, আর মন্দকে সাজানো হয় সুন্দর নামে।
“শোনো, নিশ্চয়ই তারাই ফাসাদকারী”
আল্লাহ তাদের দাবি খণ্ডন করে বলেন, “শোনো, নিশ্চয়ই তারাই ফাসাদকারী।” এই একটি বাক্যে আল্লাহ চারটি ভাষাগত হাতিয়ারে জোর দিয়েছেন: “আলা” (মনোযোগ আকর্ষণ করে গুরুত্ব বাড়ায়, বাংলায় “শোনো”), “ইন্না” (তাকিদ বা জোর), “হুম” (দামিরুল ফাসল, অতিরিক্ত জোর), এবং “আল-মুফসিদুন”-এর “আল” (যেন সব ফাসাদ কেবল তাদেরই মধ্যে সীমিত—এক ধরনের অতিশয়োক্তি)। বাস্তবে মুনাফিক ছাড়াও ফাসাদকারী আছে, কিন্তু এই “আল” দিয়ে যেন ফাসাদকে তাদেরই মধ্যে সীমাবদ্ধ করে তাদের অপরাধের গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে—অথচ তারা তা উপলব্ধিও করে না।
“মানুষ যেভাবে ঈমান এনেছে”
“তোমরা ঈমান আনো যেভাবে মানুষ ঈমান এনেছে”—এখানে “মানুষ” বলতে সাহাবিগণ, কারণ তখন তাঁরা ছাড়া অন্য কোনো মুমিন ছিল না। অর্থাৎ ঈমানের গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড হলো সাহাবিগণের ঈমান—মুখের স্বীকৃতির সঙ্গে অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস ও অঙ্গের আমল। এখান থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ নীতি: কেউ যদি দাবি করে সে “কেবল কুরআন মানে,” তবু বিভ্রান্ত, কারণ কুরআনই সাহাবিগণের ঈমানকে মানদণ্ড বানিয়েছে; সত্যিকার কুরআন-অনুসারী হলে তাকে সাহাবিগণের বোঝাপড়াই গ্রহণ করতে হবে।
মুনাফিকরা বলে, “আমরা কি নির্বোধদের মতো ঈমান আনব?”—অর্থাৎ তারা সাহাবিগণকে নির্বোধ বলছে। এটি ভয়ংকর কথা। তাই সাহাবিগণের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ বা তা ছড়ানো নিফাকের এক লক্ষণ; সাহাবিগণই দ্বীনের বাহক, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাক্ষ্যে তাঁরা শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম, তাই তাঁদের অবমাননা গুরুতর বিষয়—এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
“সাফিহ” (নির্বোধ) শব্দের অর্থ—যার বিবেক ভারসাম্যহীন, ভালো-মন্দ বোঝে না। ইবনুল কাইয়িম বলেন, এটি চরম মূর্খতা—যে ক্ষতিকরটাই বেছে নেয়। যেমন কেউ অর্থ ব্যয়ে বেহিসাবি হলে শরিয়ত তার সম্পদ রক্ষায় অভিভাবক নিয়োগ করে। মুনাফিকরা সাহাবিগণকে নির্বোধ ভাবে এই কারণে যে, সাহাবিগণ তাদের “চাতুরী” বোঝেন না—অর্থাৎ মুখে মুসলিম দাবি করলেই সব সুবিধা মেলে, এই সুবিধাবাদ তাঁরা ধরতে পারেন না; বরং তাঁরা ইসলামের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করেছেন। অথচ প্রকৃত নির্বোধ তারাই।
প্রকাশ্যে ঈমান, গোপনে উপহাস
মুমিনদের সঙ্গে দেখা হলে তারা বলে “আমরা ঈমান এনেছি,” আর নিভৃতে নিজেদের “শয়তানদের” সঙ্গে মিলিত হলে বলে, “আমরা তো তোমাদেরই সঙ্গে, আমরা কেবল উপহাস করছিলাম।” আরবিতে প্রতিটি অবাধ্য মন্দ সত্তাকে “শয়তান” বলা হয়—তা মানুষ হোক বা জিন। এখানে “শয়তান” মানে মানুষরূপী শয়তান, অর্থাৎ মুনাফিকদের সঙ্গী ও নেতারা।
আল্লাহ তাদের সঙ্গে উপহাস করেন
“আল্লাহ তাদের সঙ্গে উপহাস করেন এবং তাদের অবাধ্যতায় অবকাশ দিয়ে বাড়তে দেন।” “ইয়ামুদ্দুহুম”-এর দুটি অর্থ—অবকাশ দেওয়া, অথবা বাড়িয়ে দেওয়া। ইমাম তাবারি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আল্লাহ অবকাশ দিয়ে তাদের অবাধ্যতা (কুফর ও গুনাহ) বাড়িয়ে দেন। এর প্রক্রিয়া: গুনাহ করেও সঙ্গে সঙ্গে কোনো বিপদ না দেখে গুনাহগার আরও বেপরোয়া হয়, তওবার কথা ভুলে যায়, ফিরে আসে না—এভাবেই অবকাশে তার অবাধ্যতা বাড়ে। আর তারা “ইয়ামাহুন”—দিশেহারা হয়ে গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খায়, বেরোতে পারে না।
আল্লাহ কীভাবে “উপহাস” করেন? আবদুর রহমান আস-সাদি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এক দিক—আল্লাহ তাদের হীন অবস্থাকেই তাদের কাছে সুন্দর করে দেখান, ফলে তারা ভাবে তারা মুমিনদের সঙ্গে পার পেয়ে যাবে (যেহেতু মুমিনরা তাদের কুফর প্রমাণ করতে পারেনি বলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি)। আরেক দিক—কিয়ামতের দিন আল্লাহ মুমিনদের সঙ্গে তাদেরও বাহ্যিক আলো দেবেন; কিন্তু মুমিনরা নিজেদের আলো নিয়ে এগিয়ে গেলে মুনাফিকদের আলো নিভে যাবে, আর তারা অন্ধকারে দিশেহারা হবে (সূরা আল-হাদিদ, ৫৭:১৩)।
তবে “উপহাস” আল্লাহর ক্ষেত্রে কীভাবে প্রযোজ্য? ইবনু তাইমিয়া (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, উপহাস বা কৌশল তখনই নিন্দনীয় যখন তা সত্য অস্বীকার বা যুলুমের উদ্দেশ্যে, বাইরে সদাচরণ দেখিয়ে ভেতরে মন্দ লুকিয়ে করা হয়। কিন্তু মুনাফিকরা মুমিনদের সঙ্গে উপহাস করেছিল বলে আল্লাহ তার প্রতিদানে তাদের সঙ্গে উপহাস করেন—এটি নিঃশর্ত নয়, বরং প্রতিদানস্বরূপ, তাই তা উত্তম ন্যায়বিচার ও প্রশংসনীয়। যেমন কেউ কোনো সৎ ব্যক্তিকে প্রতারণার চেষ্টা করলে সেই বুদ্ধিমান ব্যক্তি তা এড়িয়ে উল্টো তাকে ফাঁদে ফেলে—তা ন্যায্য ও প্রশংসনীয়; আল্লাহর ক্ষেত্রে তা আরও যথার্থ।
ক্ষতির ব্যবসা
“এরাই তারা, যারা হিদায়াতের বিনিময়ে ভ্রষ্টতা কিনেছে; তাই তাদের ব্যবসা লাভজনক হয়নি।” মুনাফিকরা যেন এক ব্যবসা করেছে—হিদায়াত বিক্রি করে ভ্রষ্টতা কিনেছে; এই লেনদেন ছিল সম্পূর্ণ ক্ষতির, আর তারা সৎপথপ্রাপ্তও ছিল না।
মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য: সারসংক্ষেপ
এই আয়াতগুলো থেকে মুনাফিকদের যে বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়: তারা গুনাহ ও ফাসাদে লিপ্ত থেকেও সংশোধনের দাবি করে; মন্দ কাজকে সুন্দর নাম দিয়ে চালায়; প্রকৃত মুমিনদের নির্বোধ ভাবে; সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখে ও প্রকাশ্যে দ্বীনের বিরুদ্ধে কিছু বলে না; আর গোপনে মুমিনদের নিয়ে উপহাস করে।
ভাষাগত কয়েকটি লক্ষণীয় দিক
কয়েকটি ভাষাগত বিষয় অর্থ বুঝতে সহায়ক। “ইজা কিলা লাহুম”-এ “কিলা” মাজহুল (কর্মবাচ্য) অতীত হলেও “ইজা”-র সঙ্গে এসে বর্তমান অর্থ দেয়—”যখন তাদের বলা হয়।” “লা তুফসিদু”-তে নিষেধের কারণে শেষের নুন লোপ পেয়েছে (নাহি বা নিষেধ)। “আলা ইন্নাহুম হুমুল মুফসিদুন” ও “আলা ইন্নাহুম হুমুস সুফাহা”—এখানে আলা, ইন্না, দামিরুল ফাসল “হুম” ও “আল”—এই চার হাতিয়ারে জোর দেওয়া হয়েছে। “আমিনু কামা আমানান নাস”-এ “কাফ”-এর পর সরাসরি ক্রিয়া (আমানা) আসায় “মা মাসদারিয়্যাহ” দরকার হয়, যা ক্রিয়াকে মাসদার অর্থে রূপান্তরিত করে—”মানুষের ঈমানের মতো।”
সবচেয়ে সূক্ষ্ম বিষয়টি চৌদ্দ নম্বর আয়াতে: “খালাও ইলা শায়াতিনিহিম।” স্বাভাবিক নিয়মে “খালা” (নিভৃতে মিলিত হওয়া) আসে “বি”-র সঙ্গে; কিন্তু এখানে “ইলা” আসায় বোঝা যায় একটি ঊহ্য ক্রিয়া আছে—”ইনসারাফা” (মুখ ফিরিয়ে সরে যাওয়া)। এই রীতিকে বলে “তাদমিন”—এক ক্রিয়া অন্য ক্রিয়ার অর্থ ধারণ করে। ফলে অর্থ দাঁড়ায়: তারা মুমিনদের থেকে মুখ ফিরিয়ে সরে গিয়ে নিভৃতে তাদের শয়তানদের সঙ্গে মিলিত হয়—অল্প কথায় ব্যাপক অর্থ।
শিক্ষা
ফাসাদ কেবল প্রকাশ্য বিশৃঙ্খলা নয়; কুফর, গুনাহ, নিফাক, মানুষকে দ্বীন থেকে বিরত রাখা—সবই ফাসাদ, এমনকি নিভৃত গুনাহও, কারণ তা বান্দাকে তার যথাযথ অবস্থা থেকে সরায় এবং দুর্যোগের কারণ হয়। মুনাফিকের স্থায়ী কৌশল হলো ফাসাদকে সংশোধনের ছদ্মবেশে এবং মন্দকে সুন্দর নামে উপস্থাপন করা—তাই কোনো কিছুর আকর্ষণীয় নাম নয়, বরং তা আল্লাহর নির্দেশের সঙ্গে মেলে কি না, সেটিই বিচার্য।
ঈমানের মানদণ্ড সাহাবিগণের ঈমান; তাই তাঁদের অবমাননা বা বিদ্বেষ নিফাকের লক্ষণ, আর তাঁদের বোঝাপড়াকে আঁকড়ে ধরাই বিভ্রান্তি থেকে মুক্তির পথ। প্রকাশ্যে ঈমান আর গোপনে বিদ্রূপ—এই দ্বিমুখিতার প্রতিদানে আল্লাহ মুনাফিকদের সঙ্গে উপহাস করেন, যা তাদের অপকর্মের ন্যায্য প্রতিদান। শেষ পর্যন্ত হিদায়াতের বিনিময়ে ভ্রষ্টতা কেনা এক চরম ক্ষতির ব্যবসা, যাতে দুনিয়া-আখিরাত উভয়ই বিফল হয়।