অন্তরে মোহর: কাফিরদের প্রসঙ্গ ও কুরআন-সুন্নাহ একত্রে বোঝার নীতি (২:৬–৭)

সূরা আল-বাকারার প্রথম পাঁচ আয়াতে মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে, কারণ কুরআনের হিদায়াত থেকে তাঁরাই উপকৃত হন। এরপরের দুই আয়াতে আল্লাহ তাআলা কাফিরদের প্রসঙ্গে কথা বলছেন। বাহ্যত মনে হয়, এই দুই আয়াত বলছে—কাফিরদের সতর্ক করা হোক বা না হোক, তারা ঈমান আনবে না, কারণ আল্লাহ তাদের অন্তর ও শ্রবণে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তাদের দৃষ্টিতে আবরণ। কিন্তু এই বাহ্যিক অর্থই উদ্দেশ্য কি না, তা বুঝতে হলে আগে একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি—কুরআন ও সুন্নাহকে একত্রে, পরস্পরের আলোকে বোঝা।

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ أَأَنذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ ۝ خَتَمَ اللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ وَعَلَىٰ سَمْعِهِمْ ۖ وَعَلَىٰ أَبْصَارِهِمْ غِشَاوَةٌ ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

নিশ্চয়ই যারা কুফরি করেছে, তুমি তাদের সতর্ক করো বা না করো—উভয়ই তাদের জন্য সমান; তারা ঈমান আনবে না। আল্লাহ তাদের অন্তরে ও শ্রবণে মোহর মেরে দিয়েছেন, আর তাদের দৃষ্টিতে আবরণ রয়েছে; আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।

একটি মৌলিক নীতি: কুরআন ও সুন্নাহ একত্রে বোঝা

কুরআনের কোনো আয়াত বা কোনো সহিহ হাদিস বুঝতে গেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি স্মরণ রাখতে হয়: কুরআন ও সুন্নাহ একসঙ্গে ওহি, আর গোটা ওহি যেন একটি অখণ্ড বক্তব্য। তাই কোনো একটি আয়াত বা হাদিসকে অন্য সব আয়াত-হাদিস থেকে বিচ্ছিন্ন করে বুঝতে গেলে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অনিবার্য। ইসলামের নামে অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত যত দল-উপদল ও বিভ্রান্তির জন্ম হয়েছে, তার মূলেই আছে এই ভুল—দলিলকে খণ্ডিতভাবে গ্রহণ করা। প্রত্যেক বিভ্রান্ত পক্ষই কোনো একটি আয়াত বা হাদিস দিয়ে দলিল দেয়, কিন্তু সেটিকে অন্য সব স্পষ্ট আয়াত-হাদিস থেকে আলাদা করে নিজের মতের সমর্থনে দাঁড় করায়।

মানুষের কথার ক্ষেত্রেও কেউ তার একটি বাক্য বিচ্ছিন্নভাবে উদ্ধৃত করলে আমরা তা মানি না; আল্লাহর কালামের ক্ষেত্রে তো তা আরও অগ্রহণযোগ্য। এর একটি সহজ উদাহরণ দুটি আয়াতে দেখা যায়। এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, তিনি শিরকের অপরাধ ক্ষমা করেন না (সূরা আন-নিসা, ৪:৪৮); অন্য আয়াতে বলেন, তিনি সব গুনাহ ক্ষমা করেন (সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫৩)। কেবল প্রথম আয়াত ধরলে কোনো মুশরিক ইসলাম গ্রহণে নিরুৎসাহিত হতে পারে; কেবল দ্বিতীয় আয়াত ধরলে শিরকের ওপর মৃত ব্যক্তির জন্যও ক্ষমার আশা করা হতে পারে। কিন্তু দুটিকে একত্রে মেলালে স্পষ্ট হয়: প্রথম আয়াত তাদের জন্য যারা তওবা না করে শিরকের ওপর মারা যায়; আর দ্বিতীয় আয়াত তাদের জন্য যারা তওবা করে। তওবার দরজা মৃত্যু পর্যন্ত খোলা—আজীবন কুফরে থাকা ব্যক্তিও শেষ জীবনে ইসলাম গ্রহণ করলে তার শিরকও ক্ষমা হয়ে যায়, কারণ ইসলাম গ্রহণই তার জন্য তওবা।

একই নীতির অভাবে কিছু মানুষ কুরআনের একটি আয়াতকে হাতিয়ার বানিয়ে সুন্নাহকে অস্বীকার করার চেষ্টা করে। কেউ কেউ দাবি করেন তাঁরা কেবল কুরআন মানেন, হাদিস নয়; দলিল হিসেবে আনেন—”আমি কিতাবে কোনো কিছু লিপিবদ্ধ করতে বাদ দিইনি” (সূরা আল-আনআম, ৬:৩৮)। কিন্তু এই আয়াতে “কিতাব” মানে কুরআন—এ কথা প্রমাণ করা যায় না; জনপ্রিয় ব্যাখ্যায় এখানে “কিতাব” মানে লাওহে মাহফুজ। আরবিতে “কিতাব” মানে যেকোনো লিখিত বস্তু, নির্দিষ্টভাবে মুসহাফ নয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, ধরে নিলাম এখানে কুরআনই উদ্দেশ্য—সেই কুরআনেই আল্লাহ পঞ্চাশ-একশোরও বেশি স্থানে রাসূলের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন, “রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো, আর যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।” সুন্নাহকে অস্বীকার করলে কুরআনের এই বহু আয়াতকেই অস্বীকার করা হয়। অর্থাৎ সুন্নাহ প্রত্যাখ্যান করে “কেবল কুরআন” মানার দাবি নিজেই স্ববিরোধী। এমনকি ধর্মত্যাগের মতো গুরুতর বিষয়ও এই নীতির আওতায় আসে: কেউ ইসলাম থেকে বেরিয়ে গেলেও তওবা করে পুনরায় ইসলামে ফিরলে তা কবুল হয়—তওবা ও ফিরে আসার দরজা মৃত্যু পর্যন্ত খোলা।

এই আয়াতের বাহ্যিক অর্থই উদ্দেশ্য নয়

আলোচ্য আয়াতের বাহ্যিক অর্থ—কাফিরদের সতর্ক করে লাভ নেই, তারা ঈমান আনবে না। কিন্তু এটিই মূল উদ্দেশ্য নয়, তিনটি কারণে।

প্রথমত, কুরআন ও হাদিসের বহু স্থানে দাওয়াতকে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং তা কার্যকর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। “তুমি তোমার রবের পথে আহ্বান করো হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে” (সূরা আন-নাহল, ১৬:১২৫); “বলো, এটিই আমার পথ, আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে আহ্বান করি, আমি ও আমার অনুসারীরা” (সূরা ইউসুফ, ১২:১০৮)। দাওয়াতের কোনো ফায়দা না থাকলে এত তাগিদ, এত ফজিলত আসত না।

দ্বিতীয়ত, শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম সাহাবিগণসহ পরবর্তী বহু মানুষ সতর্কবার্তা পেয়ে কুফর ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। সাহাবিগণের অনেকেই ইসলামের আগে মুশরিক-কাফির ছিলেন; দাওয়াত পেয়ে তাঁরাই হলেন শ্রেষ্ঠ মানুষ। তাই এই আয়াত সব কাফিরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

তৃতীয়ত, সালাফের তাফসিরই আমাদের চূড়ান্ত মানদণ্ড, আর তাঁদের ব্যাখ্যায় স্পষ্ট—এই আয়াত সব কাফিরের জন্য নয়।

দাওয়াতের কার্যকারিতা: কুরআন ও হাদিসের সাক্ষ্য

আল্লাহ বলেন, “যে মৃত ছিল, অতঃপর আমি তাকে জীবিত করলাম এবং তাকে এমন আলো দিলাম যা নিয়ে সে মানুষের মধ্যে চলে—সে কি তার মতো, যে অন্ধকারে নিমজ্জিত, তা থেকে বের হতে পারে না?” (সূরা আল-আনআম, ৬:১২২)। ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, এর অর্থ—সে কুফরের কারণে অন্তরে মৃত ছিল, আল্লাহ তাকে ঈমান দিয়ে জীবিত করলেন ও হিদায়াত দিলেন। অর্থাৎ কাফিরও হিদায়াত পায়।

খায়বারের যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘোষণা দিলেন:

لَأُعْطِيَنَّ الرَّايَةَ غَدًا رَجُلًا يَفْتَحُ اللَّهُ عَلَى يَدَيْهِ، يُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيُحِبُّهُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ

“আগামীকাল আমি এমন এক ব্যক্তিকে পতাকা দেব, যার হাতে আল্লাহ বিজয় দেবেন; সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালোবাসেন।” সাহাবিগণ সারা রাত আলোচনা করলেন কে সেই সৌভাগ্যবান। সকালে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আলি ইবনু আবি তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে ডাকলেন; তাঁর চোখে অসুখ ছিল, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর চোখে থুতু লাগিয়ে দুআ করলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে তিনি সুস্থ হয়ে গেলেন। তাঁকে পতাকা দিয়ে পাঠানোর সময় নির্দেশ এলো, শত্রুদের ইসলামের দিকে আহ্বান করতে ও আল্লাহর হক সম্পর্কে জানাতে; তারপর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন:

فَوَاللَّهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلًا وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ

“আল্লাহর কসম, আল্লাহ যদি তোমার মাধ্যমে একজন মানুষকেও হিদায়াত দেন, তা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম।” (বুখারি ও মুসলিম; সাহল ইবনু সাদ থেকে বর্ণিত)। লাল উট ছিল আরবদের কাছে মূল্যবান সম্পদ; অর্থাৎ কারও হিদায়াতের উপলক্ষ হওয়া বিপুল সম্পদের চেয়েও শ্রেয়। তাই দাওয়াত—সরাসরি হোক, বই বা বক্তৃতার মাধ্যমে হোক—যেকোনো উপায়ে কেউ হিদায়াত পেলে তার সওয়াব উপলক্ষকারীর আমলনামায় যোগ হয়।

আরেকটি ঘটনা আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত:

كَانَ غُلَامٌ يَهُودِيٌّ يَخْدُمُ النَّبِيَّ ﷺ فَمَرِضَ، فَأَتَاهُ النَّبِيُّ ﷺ يَعُودُهُ، فَقَعَدَ عِنْدَ رَأْسِهِ فَقَالَ لَهُ: أَسْلِمْ، فَنَظَرَ إِلَى أَبِيهِ وَهُوَ عِنْدَهُ، فَقَالَ لَهُ: أَطِعْ أَبَا الْقَاسِمِ، فَأَسْلَمَ، فَخَرَجَ النَّبِيُّ ﷺ وَهُوَ يَقُولُ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْقَذَهُ مِنَ النَّارِ

“এক ইহুদি বালক নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সেবা করত। সে অসুস্থ হলে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে দেখতে গেলেন, তার শিয়রে বসে বললেন, ইসলাম গ্রহণ করো। সে তার পিতার দিকে তাকাল—যেন অনুমতি চাইছে; পিতা বলল, আবুল কাসিমের কথা মানো। তখন সে ইসলাম গ্রহণ করল। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেরিয়ে এলেন এই বলতে বলতে, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করলেন।” (বুখারি)। অর্থাৎ দাওয়াত কার্যকর হয়।

“যারা কুফরি করেছে”: সালাফের তিন ব্যাখ্যা

এই আয়াতে “যারা কুফরি করেছে” বলতে কারা, সে সম্পর্কে সালাফ থেকে তিনটি ব্যাখ্যা এসেছে। প্রথমটি ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে—রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবার হিদায়াতের জন্য অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন, তাই আল্লাহ জানিয়ে দিলেন, যাদের ভাগ্যে কুফর নির্ধারিত তারা হিদায়াত পাবে না; যত দাওয়াতই দাও, একটি দল কাফিরই থেকে যাবে। ইবনু উসাইমিন (রহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন, এতে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জন্য এক ধরনের সান্ত্বনা রয়েছে—সবাই হিদায়াত পাবে না।

দ্বিতীয় ব্যাখ্যা ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকেই—এটি নির্দিষ্ট কিছু মানুষের ক্ষেত্রে, যেমন কতিপয় ইহুদি আলিম এবং আউস-খাযরাজ গোত্রের কিছু মুনাফিক নেতা, যারা জেনেবুঝে ভ্রষ্টতা বেছে নিয়েছিল; ইহুদি আলিমরা নিজেদের কিতাব থেকে জানত শেষ নবী সত্য, তবু হিংসা বা নেতৃত্বের লোভে তা মানতে রাজি ছিল না।

তৃতীয় ব্যাখ্যা তাবিয়ি আবুল আলিয়া থেকে—এটি বদর যুদ্ধে নিহত কুরাইশ নেতাদের ক্ষেত্রে, যেমন আবু জাহল, উমাইয়া ইবনু খালাফ, ওয়ালিদ ইবনুল মুগিরা প্রমুখ, যারা অহংকারবশত কুফর-শিরকে অটল থেকে শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থায়ই মারা যায়।

এই তিন মত পরস্পরবিরোধী নয়; সবগুলোই দৃষ্টান্তমাত্র, এবং সবার মূল বক্তব্য এক—এই আয়াত সব কাফিরের জন্য নয়, বরং তাদের একটি অংশের জন্য প্রযোজ্য।

অন্তরে মোহর: আয়াতের ব্যাখ্যা

সপ্তম আয়াতে বলা হচ্ছে, একটি অংশের ঈমান না আনার কারণ—আল্লাহ তাদের অন্তর ও শ্রবণে মোহর মেরেছেন এবং দৃষ্টিতে আবরণ দিয়েছেন। তাবিয়ি সাঈদ আল-মাকবুরি (রহিমাহুল্লাহ) সংক্ষেপে বলেছেন, তাদের কুফরের কারণেই তাদের অন্তরে মোহর মারা হয়েছে—অর্থাৎ এটি তাদের পূর্ববর্তী কুফরের শাস্তি।

ইমাম আত-তাবারি (রহিমাহুল্লাহ) এখানে একটি ভুল ব্যাখ্যা খণ্ডন করেছেন। কেউ কেউ “মোহর মারা”-কে রূপক (মাজায) ধরে বলে, এর অর্থ কেবল অন্তরে অহংকার ও সত্যের প্রতি উদাসীনতা থাকা—যেমন কেউ অহংকারবশত শুনতে না চাইলে তাকে “বধির” বলা হয়, যদিও সে বধির নয়। ইমাম তাবারি এই রূপক-ব্যাখ্যা অগ্রহণযোগ্য বলেছেন; কারণ আল্লাহ স্বয়ং বলেছেন তিনিই তাদের অন্তরে মোহর মেরেছেন। তাদের অন্তরে অহংকার ও উদাসীনতা থাকার বিষয়টি সত্য, কিন্তু “মোহর”-এর অর্থ কেবল সেটুকু নয়; বরং যা বলা হয়েছে তা-ই উদ্দেশ্য—আল্লাহ প্রকৃতই তাদের অন্তরে মোহর মেরেছেন।

ইবনু কাসির (রহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন, তাবারি যে ভুল ব্যাখ্যা খণ্ডন করেছেন, যামাখশারি সেটিকেই দীর্ঘভাবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে আয়াতটির পাঁচ রকম দুর্বল ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যার মূলে তাঁর মুতাযিলি আকিদা। মুতাযিলা এক ভ্রান্ত মতাবলম্বী দল, যারা মনে করে আল্লাহ কারও অন্তরে মোহর মেরে হিদায়াত থেকে বঞ্চিত করেন না—কারণ তাদের ধারণায় তা যুলুম হয়ে যাবে; তারা এমনও বিশ্বাস করে যে মানুষের কর্ম মানুষেরই সৃষ্টি, আল্লাহর নয়। ইবনু কাসির এর সমাধানে দুটি আয়াত এনেছেন: “যখন তারা বক্র হলো, আল্লাহ তাদের অন্তর বক্র করে দিলেন” (সূরা আস-সফ, ৬১:৫); এবং “আমি তাদের অন্তর ও দৃষ্টি ফিরিয়ে দেব, যেমন তারা প্রথমবার এতে ঈমান আনেনি” (সূরা আল-আনআম, ৬:১১০)।

এখান থেকে একটি মৌলিক নীতি স্পষ্ট হয়: আল্লাহর পক্ষ থেকে কাউকে পথভ্রষ্ট করা বা অন্তরে মোহর মারা একটি শাস্তি, যা আসে পূর্ববর্তী অপরাধের পর; আর শাস্তি হলো ন্যায়বিচার, আর ন্যায়বিচার সর্বদা প্রশংসনীয়। তাই আল্লাহ কাউকে পথভ্রষ্ট করলেও তা যথাযথ ও ন্যায্য, বিনা কারণে নয়।

এ বিষয়ে সবচেয়ে সুন্দর বক্তব্য ইবনুল কাইয়িম (রহিমাহুল্লাহ)-এর, তাঁর “শিফাউল আলিল” গ্রন্থে। তিনি বলেন, এখানেই বহু মানুষ ভুল করে এবং আল্লাহর নাম ও গুণের দাবির বিপরীত ধারণা পোষণ করে। কুরআন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করে, আল্লাহ কোনো বান্দার অন্তরে প্রথমেই মোহর মারেন না—যখন তাকে প্রথম ঈমানের নির্দেশ দেওয়া হয় ও সত্য স্পষ্ট করা হয়, তখন নয়। বরং বারবার আহ্বান ও স্পষ্ট নিদর্শন দেওয়ার পরও যখন সে বারবার মুখ ফেরায় এবং কুফর ও উদাসীনতায় সীমা ছাড়ায়, তখন তার অন্তরে মোহর মারা হয়। প্রথম অবস্থায় তার কুফর ও উদাসীনতা “মোহর”-এর অধীনে ছিল না; তখন তা ছিল তার নিজের পছন্দ। কিন্তু বারবার ঘটতে ঘটতে তা তার স্বভাব ও অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন অন্তর মোহরাঙ্কিত হয়। তাই এই বিধান সব কাফিরের জন্য সাধারণভাবে প্রযোজ্য নয়—যারা পরে ঈমান আনল ও রাসূলকে সত্য মানল, তারাও আগে কাফির ছিল, অথচ তাদের অন্তরে মোহর মারা হয়নি। এই আয়াত সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর জন্য, যাদের আল্লাহ দুনিয়াতেই এই অগ্রিম শাস্তি দিয়েছেন।

ইমাম তাবারি (রহিমাহুল্লাহ) এই আয়াতের অর্থকে একটি হাদিসের অর্থের সমতুল্য বিবেচনা করেছেন:

إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا أَخْطَأَ خَطِيئَةً نُكِتَتْ فِي قَلْبِهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ، فَإِذَا هُوَ نَزَعَ وَاسْتَغْفَرَ وَتَابَ سُقِلَ قَلْبُهُ، وَإِنْ عَادَ زِيدَ فِيهَا حَتَّى تَعْلُوَ قَلْبَهُ، وَذَٰلِكَ الرَّانُ الَّذِي ذَكَرَهُ اللَّهُ: كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُوا يَكْسِبُونَ

“বান্দা যখন কোনো গুনাহ করে, তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে; সে যদি তা ছেড়ে দেয়, ইস্তিগফার ও তওবা করে, তবে তার অন্তর পরিষ্কার হয়ে যায়। আর যদি সে পুনরায় করে, দাগ বাড়তে থাকে, শেষে তা তার পুরো অন্তর ঢেকে ফেলে—এটিই সেই ‘রান’ (আবরণ), যা আল্লাহ উল্লেখ করেছেন: ‘কখনো নয়, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে মরিচার মতো জমেছে’ (সূরা আল-মুতাফফিফিন, ৮৩:১৪)।” (তিরমিজি; হাদিসটি হাসান)।

গুনাহও হৃদয়ে আবরণ ফেলে

এই ব্যাখ্যা থেকে আমাদের জন্যও এক সতর্কতা: “মোহর” যেমন কাফিরের অন্তরে হিদায়াতের পথ বন্ধ করে দেয়, তেমনি গুনাহের আবরণও (রান) অন্তরে জমে হিদায়াতের পথে আংশিক বা পূর্ণ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে—এটিও এক শাস্তি। কেউ ভাবতে পারেন এই আয়াত তো কেবল কাফিরদের নিয়ে; কিন্তু গুনাহের এই আবরণ-প্রক্রিয়া আমাদের জন্যও ভয়ের কারণ। তাই সর্বদা ইস্তিগফার করা, তওবা করা ও বারবার আল্লাহর দিকে ফিরে আসা প্রয়োজন। তবে “রান” বা আংশিক আবরণের পরও ইস্তিগফারের মাধ্যমে ফিরে আসা সম্ভব—অসম্ভব নয়, তবে ঝুঁকি থেকে যায়। আল্লাহ যে আমাদের এত সময় ও সুযোগ দিয়ে রেখেছেন, তা-ই তাঁর অনুগ্রহ; এই সুযোগ থাকতেই ফিরে আসা উচিত।

হিদায়াত কোনো একবারের বিষয় নয়; প্রতিটি মুহূর্তে নতুন হিদায়াত প্রয়োজন। এ কারণেই আমরা দৈনিক অন্তত সতেরো বার “ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম” বলতে শিখেছি—আল্লাহর কাছে হিদায়াত চাওয়ার এই গুরুত্ব যেন আমরা উপলব্ধি করি।

শিক্ষা

কুরআন ও সুন্নাহ একত্রে, পরস্পরের আলোকে বোঝাই সঠিক বোঝাপড়ার মূল শর্ত; দলিলকে খণ্ডিতভাবে গ্রহণ করাই ইসলামের নামে যাবতীয় বিভ্রান্তির উৎস। তাই কোনো আয়াতের বাহ্যিক অর্থ ধরে সিদ্ধান্তে ছুটে যাওয়া যাবে না—যেমন এই আয়াতের বাহ্যিক অর্থ সব কাফিরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, বরং নির্দিষ্ট সেই গোষ্ঠীর জন্য যারা বারবার সত্য প্রত্যাখ্যান করে অন্তরে মোহর ডেকে এনেছে।

আল্লাহর পক্ষ থেকে পথভ্রষ্ট করা বা অন্তরে মোহর মারা বিনা কারণে নয়; তা পূর্ববর্তী অপরাধের ন্যায্য শাস্তি, আর শুরুতে প্রতিটি মানুষের অন্তরই হিদায়াত গ্রহণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। তওবা ও হিদায়াতের দরজা মৃত্যু পর্যন্ত খোলা, তাই কারও ব্যাপারে নিরাশ হওয়া চলে না। গুনাহও অন্তরে আবরণ ফেলে হিদায়াতের পথ রুদ্ধ করতে পারে—এই ভয়ে নিরন্তর ইস্তিগফার ও তওবায় ফিরে আসা জরুরি।

সবশেষে, দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাজ সত্য পৌঁছে দেওয়া, হিদায়াতের নিশ্চয়তা দেওয়া নয়; আর মানুষকে খুশি করতে গিয়ে ইসলামের শিক্ষা বিকৃত করে উপস্থাপন করা উচিত নয়। আমাদের কাজ সত্যকে যথাযথভাবে তুলে ধরা—যে হিদায়াত পাওয়ার, সে পাবে।