মুনাফিকদের পরিচয়: ঈমান, কুফর ও নিফাকের স্বরূপ (২:৮–১০)

সূরা আল-বাকারার সূচনায় আল্লাহ তাআলা প্রথমে মুত্তাকিদের, এরপর কাফিরদের পরিচয় দিয়েছেন। এবার আসছে তৃতীয় এক শ্রেণির পরিচয়—মুনাফিক। মজার বিষয়, এই আয়াতগুলোতে “নিফাক” বা “মুনাফিক” শব্দটি একবারও আসেনি, তবু প্রাচীন মুফাসসিরগণের সর্বসম্মত মত—এই আয়াতগুলো সেই লোকদের সম্পর্কে যারা অন্তরে কুফর গোপন রেখে মুখে ইসলামের ঘোষণা দেয়। এই মুনাফিকদের বোঝার আগে ঈমান ও কুফরের স্বরূপ জানা জরুরি, কারণ নিফাক আসলে কুফরেরই সবচেয়ে নিকৃষ্ট এক প্রকার।

وَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُم بِمُؤْمِنِينَ ۝ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ ۝ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ

আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনেছি; অথচ তারা মুমিন নয়। তারা আল্লাহ ও মুমিনদের সঙ্গে প্রতারণা করে; কিন্তু তারা কেবল নিজেদেরই প্রতারিত করে, অথচ তারা তা উপলব্ধি করে না। তাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে; অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি বাড়িয়ে দিয়েছেন; আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি, কারণ তারা মিথ্যা বলত।

এই আয়াতগুলো মুনাফিকদের সম্পর্কে

এই আয়াতগুলোতে “মুনাফিক” শব্দ না থাকলেও প্রাচীন মুফাসসিরগণ একমত যে, এগুলো সেই লোকদের বর্ণনা যারা অন্তরে কুফর লুকিয়ে মুখে ইসলামের দাবি করে। সাহাবি ইবনু মাসউদ ও ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুম), তাবিয়ি আবুল আলিয়া, মুজাহিদ, কাতাদা, আস-সুদ্দি ও আর-রাবি ইবনু আনাস প্রমুখ এবং পরবর্তী প্রজন্মের মুফাসসিরগণ—সবার কাছ থেকেই এই ব্যাখ্যা বর্ণিত, এবং আয়াতের প্রেক্ষাপট থেকেও তা স্পষ্ট।

ঈমান কী: হৃদয়, মুখ ও আমল

ঈমানের শাব্দিক অর্থ বিশ্বাস বা স্বীকৃতি। শরিয়তে ঈমানের দুটি দিক। প্রথম দিক—আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যে সংবাদ (খবর) দিয়েছেন তা দৃঢ় বিশ্বাসে গ্রহণ করা ও সত্য বলে স্বীকার করা। দ্বিতীয় দিক—আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধান (হুকুম) অনুযায়ী আমল করা, সীমারেখা মেনে দ্বীন বাস্তবায়ন করা। কুরআন-হাদিস খুললে মূলত দুটি জিনিস পাওয়া যায়: সংবাদ ও বিধান। সংবাদ গ্রহণ করতে হয় দৃঢ় বিশ্বাসে, আর বিধান পালন করতে হয় আমলে। তাই ঈমান হলো হৃদয়ের বিশ্বাস, মুখের স্বীকৃতি ও অঙ্গের আমল—এই তিনের সমন্বয়; আর ঈমান বাড়ে ও কমে। এটিই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা।

ঈমানের সংজ্ঞায় মানুষ দুই প্রান্তে ভুল করেছে। এক প্রান্তে কেউ ঈমানকে কেবল অন্তরের জ্ঞান বা স্বীকৃতিতে সীমিত করে আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না—অথচ আলোচ্য অষ্টম আয়াতই এই ভুল খণ্ডন করে: এরা মুখে “আমরা ঈমান এনেছি” বলেছে, তবু আল্লাহ বলছেন “তারা মুমিন নয়।” অর্থাৎ কেবল মুখের স্বীকৃতি ঈমান নয়। অপর প্রান্তে কেউ বাড়াবাড়ি করে বলে, ঈমানের কোনো একটি অংশ (যেমন কোনো আমল) ছুটে গেলে গোটা ঈমানই চলে যায়, ফলে গুনাহগার কাফির হয়ে যায়। কিন্তু আহলুস সুন্নাহর অবস্থান মধ্যপন্থী: বড় গুনাহে ঈমান গুরুতরভাবে দুর্বল হতে পারে, তবে তার মূল যদি অন্তরে থাকে তবে সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায় না, তাকে কাফির বলা যায় না—যদিও সে অন্য গুনাহগারদের মতো শাস্তির যোগ্য। এই মধ্যপন্থী আকিদাই কুরআন-হাদিসের আলোকে সঠিক, আর একেই আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে।

কুফরের প্রকারভেদ

ঈমানের বিপরীত কুফর, আর কুফরও কেবল অন্তরের অস্বীকার নয়—তা নানা উপায়ে হতে পারে। এখান থেকেই নিফাক বোঝার পথ খোলে।

প্রথমত, তাকযিব বা অস্বীকার (ইনকার, জুহুদ)। কেউ অন্তরে বিশ্বাস করে শেষ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সত্য নবী নন, কিংবা আখিরাত নেই—মুখে না বললেও এই অন্তরের অস্বীকারই কুফর। আবার কেউ মুখে ঘোষণা করে দ্বীনের কোনো মৌলিক বিষয় অস্বীকার করলে—অন্তরে বিশ্বাস থাকুক বা না থাকুক—সেই ঘোষণাও কুফর। এখানে একটিমাত্র ব্যতিক্রম: কেউ যদি অন্তরে দৃঢ় ঈমান রেখে প্রাণনাশ বা গুরুতর ক্ষতির প্রকৃত হুমকির মুখে বাধ্য হয়ে মুখে কুফরি কথা বলে, তবে তা ক্ষমার্হ—তবে শর্ত হলো হুমকি বাস্তব হতে হবে, নিছক লজ্জা বা হীনম্মন্যতা নয়।

দ্বিতীয়ত, সন্দেহের কুফর (শাক)। কেউ যদি বলে আখিরাত হতেও পারে, না-ও হতে পারে; শেষ নবী সত্য হতেও পারেন, না-ও হতে পারেন—এই দোদুল্যমানতাও কুফর।

তৃতীয়ত, বিমুখতার কুফর (ইরাদ)। কেউ দ্বীন জানতেই আগ্রহী নয়, মানতেও চায় না—”আমাকে ধর্ম নিয়ে কিছু বলো না, আমি তো ভালো মানুষ”—দ্বীন থেকে সম্পূর্ণ মুখ ফিরিয়ে রাখা এক ধরনের কুফর। তবে কেউ দ্বীনের কিছু অংশ পালন করে, কিছু করে না (যেমন সালাত পড়ে কিন্তু লোভবশত যাকাত দেয় না, অথচ তা যে দিতে হবে তা স্বীকার করে)—এটি এই বিমুখতার কুফর নয়, বরং গুনাহ।

চতুর্থত, অহংকার ও অবাধ্যতার কুফর (ইস্তিকবার)। এর পূর্ণ প্রতিমূর্তি ইবলিস। ইবলিসের অন্তরে অবিশ্বাস নেই, সে সত্য অস্বীকারও করেনি, তার সন্দেহও নেই—বরং তার ইয়াকিন আমাদের চেয়ে দৃঢ়। তবু সে অহংকারবশত আল্লাহর আদেশ মানতে অস্বীকার করল। এই অহংকার আল্লাহর প্রতি হতে পারে, আবার নবী-রাসূলের প্রতিও—কেউ যদি অহংকারবশত রাসূলের কর্তৃত্ব মানতে অস্বীকার করে, তা-ও এই শ্রেণির কুফর। লক্ষণীয়, এটি সেই অবাধ্যতা নয় যা প্রবৃত্তি বা লোভের বশে হয় (যেমন মদ, ব্যভিচার বা সুদ); বরং আদেশ পালনে অহংকার অনুভব করে তা থেকে বিরত থাকা।

পঞ্চমত, বিদ্রূপ ও উপহাসের কুফর (ইস্তিহযা)। আল্লাহ, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বা দ্বীনের কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-উপহাস বা গালমন্দ করা কুফর। এখানে একটি পার্থক্য জরুরি: আদেশ পালনে যে স্বাভাবিক কষ্ট হয় (যেমন শীতের সকালে ঠান্ডা পানিতে অজু) তা ঘৃণা নয়; ঘৃণা হলো বিধানটিকেই অপছন্দ করা—সেটিই কুফর।

ষষ্ঠত, নিফাক—কুফরের সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রকার। উপরের বিষয়গুলো অন্তরে থাকা সত্ত্বেও কেউ মুখে “আমি মুসলিম” দাবি করে, অথচ অন্তরে ইসলামের প্রতি অবিশ্বাস, সন্দেহ বা বিদ্বেষ পোষণ করে—এটিই নিফাক।

নিফাক: বড় ও ছোট

ইবনুল কাইয়িম (রহিমাহুল্লাহ) নিফাককে দুই ভাগে ভাগ করেছেন: বড় নিফাক বা আকিদাগত নিফাক, এবং ছোট নিফাক বা আমলগত নিফাক। বড় নিফাক জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে স্থায়ী বসবাস নির্ধারণ করে—যেমন কেউ মুসলিমদের কাছে আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব ও আখিরাতে বিশ্বাসের ঘোষণা দেয়, অথচ অন্তরে এসব সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। ইবনু রজব (রহিমাহুল্লাহ) যোগ করেছেন, এই আকিদাগত নিফাকই সেই নিফাক যা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে ছিল এবং যার নিন্দায় কুরআন নাযিল হয়েছে, যাদের কাফির ঘোষণা করা হয়েছে ও জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরের কথা বলা হয়েছে (সূরা আন-নিসা, ৪:১৪৫)। আলিমগণ বলেছেন, আকিদাগত নিফাক ছয়টি বিষয়ের মাধ্যমে ঘটে: রাসূলকে বা তিনি যা এনেছেন তার কোনো কিছু অস্বীকার করা; রাসূলকে বা তাঁর আনীত কোনো কিছুকে ঘৃণা করা; রাসূলের দ্বীনের পরাজয়ে আনন্দিত হওয়া; আর তাঁর দ্বীনের বিজয়ে অসন্তুষ্ট হওয়া।

মুনাফিক যেহেতু অন্তরের কুফর গোপন করে, তাই তাকে স্পষ্টভাবে কাফির বলে চিহ্নিত করা যায় না; বাহ্যত ইসলামের ঘোষণাকারীর সঙ্গে মুসলিমের মতোই আচরণ করা হয়—সে মুসলিম সমাজে বাস করে, বিয়ে করে, মৃত্যুর পর তার জানাজা ও দাফন হয়, কারণ অন্তর দেখা আমাদের এখতিয়ারে নেই এবং আল্লাহ আমাদের সেই দায়িত্ব দেননি। তবে বাহ্যিক এই ঘোষণা অন্তরে ঈমান থাকার নিশ্চয়তা নয়। তাই মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য জানা জরুরি—যাতে আমরা সতর্ক থাকতে পারি, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যাতে এসব বৈশিষ্ট্য আমাদের নিজেদের মধ্যে না আসে।

ছোট নিফাক বা আমলগত নিফাক

ছোট নিফাকের ব্যাপারে আমাদের অধিক সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এর মূল স্বরূপ—ভেতর ও বাহিরের অমিল। অন্তরে ঈমানের মূল থাকে, কিন্তু আমলে সেই ঈমানের দাবি পূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয় না। এতে ঈমান বাতিল হয় না, তবে ব্যক্তি গুনাহগার হয় এবং অন্য গুনাহগারদের মতো শাস্তির যোগ্য হয়—তবে জাহান্নামে স্থায়ী নয়, সুপারিশে মুক্তির সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু এই আমলগত নিফাক আকিদাগত নিফাকের প্রথম ধাপ; কেউ এই পথে চলতে থাকলে ও তা অভ্যাসে পরিণত হলে শেষে বড় নিফাকে পতিত হতে পারে।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا: إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ، وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ

“চারটি বৈশিষ্ট্য যার মধ্যে থাকবে সে খাঁটি মুনাফিক, আর যার মধ্যে এর একটি থাকবে তার মধ্যে নিফাকের একটি বৈশিষ্ট্য থাকবে, যতক্ষণ না সে তা ত্যাগ করে: আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে, কথা বললে মিথ্যা বলে, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে, আর ঝগড়া করলে সীমা ছাড়ায়।” (বুখারি ও মুসলিম)। মিথ্যা, অঙ্গীকার ভঙ্গ ও আমানতে খেয়ানত—এগুলো আমাদের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে; আমানত কেবল সম্পদের নয়, দায়িত্ব ও কর্মেরও। সালাফ এসব ব্যাপারে কতটা সতর্ক ছিলেন তার এক দৃষ্টান্ত: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু সালিহ আল-উসাইমিন (রহিমাহুল্লাহ) সম্পর্কে বর্ণিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে ঘরে ফোন করার প্রয়োজন হলে তিনি বাইরে গিয়ে নিজের অর্থে ফোন করতেন, প্রতিষ্ঠানের ফোন ব্যবহার করতেন না—কারণ, তাঁর ভাষায়, এই ফোন দাপ্তরিক কাজের জন্য দেওয়া হয়েছে, ব্যক্তিগত কাজের জন্য নয়।

সাহাবিগণ নিজেদের ব্যাপারে নিফাকের ভয় করতেন। হানযালা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একবার আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললেন, “হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে।” তিনি ব্যাখ্যা করলেন—রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে জান্নাত-জাহান্নামের কথা শুনলে যেন তা চোখের সামনে দেখতে পান, কিন্তু ঘরে ফিরে সংসার ও দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত হলে সেই অবস্থা বদলে যায়। আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, তাঁরও একই অবস্থা। তাঁরা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে গেলে তিনি বললেন:

وَلَكِنْ يَا حَنْظَلَةُ سَاعَةً وَسَاعَةً

“হে হানযালা, একেক সময় একেক অবস্থা।” (মুসলিম)। তিনি জানালেন, তোমরা যদি সর্বদা সেই অবস্থায় থাকতে, তবে ফেরেশতারা তোমাদের বিছানায় ও পথে এসে মুসাফাহা করত; কিন্তু মানুষের স্বভাবই এই—কখনো স্মরণ, কখনো ব্যস্ততা। তাই অন্তরকে বারবার সজীব করা প্রয়োজন; দীর্ঘ গাফলতিতে ডুবে থাকলে অন্তরে আল্লাহভীতি ও সৎকাজের প্রেরণা ফিকে হয়ে আসে। ইবনু আবি মুলাইকা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, তিনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ত্রিশজন সাহাবিকে পেয়েছেন, যাঁরা প্রত্যেকেই নিজের ব্যাপারে নিফাকের ভয় করতেন—কেউ বলেননি যে তাঁর ঈমান জিবরাইল-মিকাইলের ঈমানের মতো।

“আমরা ঈমান এনেছি”—অথচ মুমিন নয়

অষ্টম আয়াতে আল্লাহ বলছেন, কিছু মানুষ মুখে বলে “আমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনেছি, অথচ তারা মুমিন নয়।” এখান থেকে স্পষ্ট, নিছক মৌখিক স্বীকৃতি ঈমান নয়। এরাই সেই আকিদাগত মুনাফিক, যাদের অন্তরে কুফর, অথচ বাহ্যত ইসলামের ঘোষণা।

তারা আল্লাহ ও মুমিনদের সঙ্গে প্রতারণা করে

নবম আয়াতে দুটি শব্দ লক্ষণীয়—”ইউখাদিউন” এবং “ইয়াখদাউন।” প্রথমটিতে একটি অতিরিক্ত আলিফ আছে। আরবিতে এই কাঠামো (মুফাআলা) অনেক সময় দুই পক্ষের পারস্পরিক কর্ম বোঝায়, যেমন “কাতালা” (হত্যা করা) থেকে “কিতাল” (পরস্পর লড়াই)। তাই এখানে দুটি অর্থ সম্ভব।

প্রথম অর্থ (দ্বিপাক্ষিক): তারা আল্লাহ ও মুমিনদের সঙ্গে প্রতারণার চেষ্টা করে, আর আল্লাহ তার প্রতিদানে তাদের প্রতারিত করেন। কেউ বলতে পারেন প্রতারণা তো মন্দ গুণ; কিন্তু প্রতারককে যখন তার প্রতারণার প্রতিদানে প্রতারিত করা হয়, তখন তা ন্যায্য ও প্রশংসনীয়—এতে আল্লাহর জ্ঞানের পূর্ণতা ও প্রজ্ঞা প্রকাশ পায়। ইমাম তাবারি (রহিমাহুল্লাহ) এই দ্বিপাক্ষিক অর্থকে প্রাধান্য দিয়ে দুটি আয়াতের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, কাফিররা যেন এই অবকাশকে নিজেদের জন্য কল্যাণ মনে না করে; আমি তাদের অবকাশ দিই কেবল যেন তাদের পাপ বাড়ে, শেষে লাঞ্ছনাকর শাস্তি (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৭৮)। মুনাফিকরা ভাবে তারা মুমিনদের বিশ্বাস করিয়ে আল্লাহকেও ধোঁকা দিয়েছে; আল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি না দেওয়ায় তাদের এই মিথ্যা ধারণা আরও পাকা হয়, তারা আরও বেপরোয়া হয়ে গুনাহ বাড়ায় ও শাস্তির যোগ্য হয়। আর কিয়ামতের দিন এর চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পাবে: মুনাফিকদের প্রথমে মুমিনদের সঙ্গেই রাখা হবে, তাদেরও আলো দেওয়া হবে; কিন্তু পুলসিরাত পার হওয়ার মুহূর্তে তাদের আলো নিভে যাবে, আর তারা মুমিনদের কাছে আলো ভিক্ষা চাইবে; তখন এক প্রাচীর তুলে দেওয়া হবে, যার ভেতরে রহমত ও বাইরে শাস্তি (সূরা আল-হাদিদ, ৫৭:১৩–১৫)। এভাবেই তাদের প্রতারণা তাদেরই ওপর ফিরবে।

দ্বিতীয় অর্থ (একপাক্ষিক): তারাই প্রতারণা করে। যেহেতু আল্লাহকে প্রতারিত করা অসম্ভব, তাই এই অর্থে “প্রতারণা”-র ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ কয়েকটি মত দিয়েছেন—রাসূল ও মুমিনদের সঙ্গে প্রতারণাকে আল্লাহ নিজের সঙ্গে প্রতারণা গণ্য করেছেন (ইয়াহইয়া ইবনু সাল্লাম); অথবা “খিদা” মানে অন্তরের বিপরীত কিছু প্রকাশ করা; অথবা তারা কল্পনা করেছিল যে তারা প্রতারণায় সক্ষম (ইবনু কাসির); অথবা কাজটি প্রতারণার আকৃতির বলেই তা “প্রতারণা” নামে অভিহিত (যামাখশারি, কুরতুবি প্রমুখ)। যে অর্থই হোক, তারা প্রকৃতপক্ষে কেবল নিজেদেরই প্রতারিত করে, অথচ তা উপলব্ধি করে না।

অন্তরে ব্যাধি

দশম আয়াতে আল্লাহ বলেন, তাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি বাড়িয়ে দিয়েছেন। এই ব্যাধি কী? অধিকাংশ মুফাসসির—ইবনু মাসউদ, ইবনু আব্বাস, আবুল আলিয়া, মুজাহিদ, কাতাদা, ইকরিমা প্রমুখ—বলেছেন এটি সন্দেহের ব্যাধি। কেউ কেউ, যেমন ইকরিমা ও তাউস (উভয়ে ইবনু আব্বাসের ছাত্র), বলেছেন এটি ব্যভিচারের প্রতি আসক্তি তথা প্রবৃত্তির ব্যাধি। যায়দ ইবনু আলি থেকে বর্ণিত, উভয় ব্যাধিই উদ্দেশ্য হতে পারে—আর যদি দুই মতের একত্র প্রয়োগে কোনো বাধা না থাকে, তবে উভয়ই গ্রহণযোগ্য। এভাবে হৃদয়ের ব্যাধি দুই প্রকার: সন্দেহ (শুবুহাত) ও প্রবৃত্তি (শাহাওয়াত)। সন্দেহের চিকিৎসা জ্ঞান—কুরআন-হাদিসভিত্তিক বিশুদ্ধ জ্ঞান যত বাড়ে, সন্দেহ তত দূর হয়; আর প্রবৃত্তির ব্যাধির চিকিৎসা লাগামহীন কামনা থেকে বিরত থাকা। এই দুই ব্যাধি থেকেই আল্লাহর আশ্রয় চাইতে হয়।

“অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি বাড়িয়ে দিয়েছেন”—এখানে প্রতিদান কর্মের অনুরূপ। তারা অন্তরে ব্যাধি লালন করেছিল, সত্য অন্বেষণ বা জ্ঞানার্জনে আগ্রহী হয়নি, তাই শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ ব্যাধি বাড়িয়ে দিলেন। আবদুর রহমান আস-সাদি (রহিমাহুল্লাহ) এখানে এক গভীর নীতি উল্লেখ করেছেন:

إِنَّ مِنْ عُقُوبَةِ السَّيِّئَةِ السَّيِّئَةَ بَعْدَهَا، وَمِنْ ثَوَابِ الْحَسَنَةِ الْحَسَنَةَ بَعْدَهَا

“এক গুনাহের শাস্তি হলো তার পরের আরেক গুনাহ, আর এক নেকির প্রতিদান হলো তার পরের আরেক নেকি।” মানুষ একটি গুনাহ করে ভাবে পরে তওবা করবে, কিন্তু শাস্তিস্বরূপ সে আরেকটি গুনাহে জড়িয়ে পড়ে; আল্লাহ দয়া না করলে এভাবে তা কুফর পর্যন্ত টেনে নিতে পারে। অন্যদিকে একটি নেক আমল খুলে দেয় আরেকটি নেক আমলের দরজা—আন্তরিকভাবে দুই রাকাত সালাত পড়লে দেখা যায় আরেকটি ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ জন্মেছে। এ কারণেই কুরআন নাযিল হলে মুমিনের ঈমান বাড়ে, কিন্তু যার অন্তরে ব্যাধি সে সেই ব্যাধিই আরও লালন করে, তাই তার কলুষ আরও বাড়ে; পক্ষান্তরে যারা হিদায়াতের পথে চলে, তাদের হিদায়াত আল্লাহ বাড়িয়ে দেন। তাই জ্ঞান পেলে তার ওপর আমল করাই হিদায়াত বৃদ্ধির শর্ত; আর জ্ঞান নিতে হবে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে, অনিশ্চিত সূত্র থেকে নয়।

ভাষাগত কয়েকটি লক্ষণীয় দিক

কয়েকটি ভাষাগত বিষয় অর্থ বুঝতে সহায়ক। “ওয়া মিনান নাস”-এ “মিন” এখানে অংশবাচক—অর্থাৎ “মানুষের একটি অংশ।” আরবিতে “মিন”-এর একাধিক অর্থ আছে, যা প্রসঙ্গ থেকে বুঝতে হয়। “ওয়া মা হুম বিমুমিনিন”-এ “মুমিনিন”-এর আগে অতিরিক্ত “বি” জোর আরোপের জন্য—তাই অর্থ “তারা মোটেও মুমিন নয়।” নবম আয়াতের “ইউখাদিউন” (মুফাআলা কাঠামো) দ্বিপাক্ষিকতার ইঙ্গিত দেয়, যা আগে আলোচিত হয়েছে। দশম আয়াতের “ফি কুলুবিহিম মারাদুন ফাযাদাহুমুল্লাহু মারাদান”-এ “ফা” সাবাবিয়্যাহ—অর্থাৎ ফলস্বরূপ; তারা ব্যাধি লালন করেছিল বলেই ফলস্বরূপ আল্লাহ ব্যাধি বাড়িয়েছেন। আর “বিমা কানু ইয়াকযিবুন”-এ “মা” মাসদারিয়্যাহ, যা পরবর্তী ক্রিয়াকে মাসদার (ক্রিয়ার নাম) অর্থে রূপান্তরিত করে—অর্থাৎ “তাদের মিথ্যা বলার কারণে।” আরবি ভাষায় “বি” সরাসরি ক্রিয়াকে ধরে না, তাই এই “মা”-র প্রয়োজন হয়। এই আয়াতের একটি কিরাআতে “ইয়াকযিবুন” (মিথ্যা বলা) এবং অন্য কিরাআতে “ইউকায্যিবুন” (অস্বীকার করা) পড়া হয়েছে; উভয় অর্থ মিলে দাঁড়ায়—তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির কারণ তাদের মিথ্যা বলা ও সত্য অস্বীকার—উভয়ই।

শিক্ষা

ঈমান কেবল অন্তরের বিশ্বাস বা মুখের ঘোষণা নয়; তা হৃদয়ের বিশ্বাস, মুখের স্বীকৃতি ও অঙ্গের আমলের সমন্বয়, যা বাড়ে ও কমে—আলোচ্য আয়াতই প্রমাণ করে নিছক মৌখিক দাবি ঈমান নয়। কুফরও কেবল অন্তরের অস্বীকার নয়; অস্বীকার, সন্দেহ, বিমুখতা, অহংকার, উপহাস ও নিফাক—নানা পথে তা আসতে পারে, তাই প্রতিটি পথ থেকেই সতর্ক থাকতে হবে।

নিফাকের সবচেয়ে বড় সতর্কতা নিজেকে নিয়ে: বড় নিফাক আমাদের মধ্যে হয়তো নেই, কিন্তু ছোট নিফাক—মিথ্যা, অঙ্গীকার ভঙ্গ, আমানতে খেয়ানত, ঝগড়ায় সীমা লঙ্ঘন—আমাদের অভ্যাসে জড়িয়ে থাকতে পারে, আর তা বাড়তে থাকলে বড় নিফাকের দিকে টেনে নিতে পারে; তাই সাহাবিদের মতো নিজের ব্যাপারে ভয় রাখা ও অন্তরকে বারবার সজীব করা প্রয়োজন। প্রতারণা যখন আল্লাহর সঙ্গে করা হয়, তখন তা ঘুরে প্রতারকের ওপরই ফেরে—এই দুনিয়ায় অবকাশের ছদ্মরূপে, আর আখিরাতে পুলসিরাতে আলো নিভে যাওয়ার রূপে। সবশেষে, প্রতিদান কর্মের অনুরূপ: এক গুনাহ ডেকে আনে আরেক গুনাহ, এক নেকি খুলে দেয় আরেক নেকির পথ—তাই জ্ঞান পেলে তার ওপর আমল করাই কল্যাণ ও হিদায়াত বৃদ্ধির পথ।