সূরা আল-বাকারার এই জায়গায় এসে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা অন্তরের এমন তিনটি রোগের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন যেগুলো মানুষকে পথভ্রষ্টতার দিকে টেনে নেয়। রোগ তিনটি হলো প্রবৃত্তির অনুসরণ (ইত্তিবাউল হাওয়া), অহংকার (ইস্তিকবার) এবং হিংসা (হাসাদ)। আয়াতগুলো বনু ইসরাইলের প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হলেও এখানে বর্ণিত এই রোগগুলো ওই সম্প্রদায়ের সেই ঐতিহাসিক আচরণেরই চিত্র, যা তাদের অন্তরে এমন কঠিন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তারা নবীদের অস্বীকার এবং হত্যা পর্যন্ত করেছে।

এই আয়াতগুলো নিছক অতীতের কোনো সম্প্রদায়ের ইতিহাস নয়। শারীরিক রোগ যেমন একবারে শেষ পরিণতিতে পৌঁছায় না, বরং ধাপে ধাপে বাড়ে, তেমনি অন্তরের এই রোগগুলোরও মৃদু ও চূড়ান্ত—উভয় স্তর আছে। বনু ইসরাইলের ক্ষেত্রে যা আমরা দেখব তা চূড়ান্ত স্তর; কিন্তু এর মৃদু রূপ আমাদের অন্তরেও থাকতে পারে। আল্লাহ এই ঘটনাগুলো অনর্থক বর্ণনা করেননি; কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ এই আয়াত পাঠ করবে, প্রত্যেকের জন্য এতে শিক্ষা রয়েছে। তাই “এটা ইহুদিদের ঘটনা, আমাদের সাথে এর সম্পর্ক নেই”—এই নিরাপত্তাবোধই সবচেয়ে বড় ভুল। রোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছার আগেই, মৃদু স্তরেই তার চিকিৎসা করা আমাদের কর্তব্য।

দুই প্রকার পথভ্রষ্টতা

পথভ্রষ্টতা বোঝার আগে একটি মূল পার্থক্য ধরে রাখা জরুরি: পথভ্রষ্টতা দুই প্রকার।

প্রথমটি জ্ঞানের অভাবজনিত পথভ্রষ্টতা। এখানে মানুষটি হয়তো আপাতদৃষ্টিতে ভালো, সে কল্যাণই চায়, কিন্তু সঠিক জ্ঞান অর্জন না করার কারণে বিভ্রান্ত পথে চলে যায়। কেউ সিলেট যেতে চায়, অথচ কোন ট্রেন সিলেট যায় তা না জেনেই সুন্দর দেখে একটি ট্রেনে উঠে বসে; মাঝপথে ভুল ধরিয়ে দিলেও আরামের মোহে সে নামতে চায় না—ফলে সে কখনোই গন্তব্যে পৌঁছায় না। বিদআত এই শ্রেণিরই দৃষ্টান্ত; বহু মানুষ কল্যাণ মনে করেই দ্বীনের মধ্যে বানোয়াট বিশ্বাস ও আমল যুক্ত করে, যা প্রত্যাখ্যাত। সূরা ফাতিহায় “ওয়ালাদ্‌দ্বাল্লীন” বলার মাধ্যমে আমরা এই পথ থেকেই আশ্রয় চাই।

দ্বিতীয়টি জ্ঞানসহ পথভ্রষ্টতা, যা আরও মারাত্মক। এখানে মানুষ সত্য জানে ও বোঝে, তবু অন্তরের বক্রতার কারণে জেনেবুঝে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে। যেমন কেউ অফিসকে জানিয়ে অফিসের কাজে সিলেট যাওয়ার কথা বলল, কিন্তু সুযোগ বুঝে জেনেশুনে কক্সবাজারের ট্রেনে উঠে বসল—এই বিচ্যুতি অজ্ঞতা নয়, বরং অন্তরের বক্রতা থেকে আসা ইচ্ছাকৃত বাছাই। বনু ইসরাইলের পথভ্রষ্টতা এই দ্বিতীয় প্রকারের।

এই দুই শ্রেণির মানুষ থেকেই আমরা সূরা ফাতিহায় আশ্রয় চেয়েছি। “গাইরিল মাগদূবি আলাইহিম”—যাদের উপর আল্লাহর ক্রোধ, তারা জেনেবুঝে অন্তরের রোগের কারণে বক্র পথ বেছে নিয়েছে; আর “ওয়ালাদ্‌দ্বাল্লীন”—যারা অজ্ঞতাবশত পথভ্রষ্ট। সূরা ফাতিহায় এই দোয়া করার ঠিক পরেই সূরা বাকারায় বনু ইসরাইল সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা যেন সেই দোয়ারই ব্যাখ্যা—আল্লাহ ধরে ধরে দেখিয়ে দিচ্ছেন “মাগদূব আলাইহিম” কারা এবং কেন তারা এই পরিণতিতে পৌঁছাল।

عَنْ عَدِيِّ بْنِ حَاتِمٍ، أَنَّ الْمَغْضُوبَ عَلَيْهِمُ الْيَهُودُ، وَأَنَّ الضَّالِّينَ النَّصَارَى

আদী ইবনু হাতিম (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত তাফসীর অনুসারে “মাগদূব আলাইহিম” দ্বারা সেই ইহুদি সম্প্রদায় এবং “দ্বাল্লীন” দ্বারা সেই খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়েছে—উভয়ের ক্ষেত্রেই বৈশিষ্ট্যটি তাদের ঐতিহাসিক আচরণের বর্ণনা, বংশগত কোনো নিয়তি নয়। এ কারণেই একই রোগ যে-কারও অন্তরে দানা বাঁধতে পারে বলে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

আয়াতের ভূমিকা: দ্বীনি নেয়ামতের স্মরণ

وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَقَفَّيْنَا مِن بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ ۖ وَآتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنَاهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ ۗ أَفَكُلَّمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَىٰ أَنفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًا كَذَّبْتُمْ وَفَرِيقًا تَقْتُلُونَ

“আর নিশ্চয়ই আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছি এবং তার পরে একের পর এক রাসূল পাঠিয়েছি। আর মারইয়াম-তনয় ঈসাকে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি দিয়েছি এবং রূহুল কুদুস দ্বারা তাকে শক্তিশালী করেছি। তবে কি যখনই কোনো রাসূল তোমাদের কাছে এমন কিছু নিয়ে এসেছেন যা তোমাদের মন চায় না, তখনই তোমরা অহংকার করেছ? অতঃপর একদলকে তোমরা মিথ্যাবাদী বলেছ এবং একদলকে হত্যা করছ।” (সূরা আল-বাকারা, ২ঃ৮৭)

আল্লাহ এই আলোচনার সূচনা করছেন বনু ইসরাইলের প্রতি তাঁর দ্বীনি অনুগ্রহ স্মরণ করিয়ে দিয়ে। “লাকাদ” শব্দটি এখানে জোর প্রদানের (এমফ্যাসিস) জন্য ব্যবহৃত হয়েছে; এর ভাষাতাত্ত্বিক গভীর বিশ্লেষণ দীর্ঘ, তবে সহজ অর্থে এটুকু বোঝাই যথেষ্ট যে বক্তব্যটি জোর দিয়ে বলা হচ্ছে—”আমি অবশ্যই মূসাকে কিতাব দিয়েছি।”

এরপর “ওয়া কাফ্‌ফাইনা মিন বাদিহি বির-রুসুল।” “কাফা” অর্থ ঘাড়ের পেছন দিক; “কাফ্‌ফাইনা” অর্থ একজনের পেছনে আরেকজনকে পাঠানো, অর্থাৎ ফলোআপ করা। “রুসুল” হলো “রাসূল”-এর বহুবচন। তাৎপর্য হলো মূসার পর আল্লাহ একাধিক নবী-রাসূল পাঠিয়ে রিসালাতের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছেন।

তারপর “ওয়া আতাইনা ঈসাব্‌না মারইয়ামাল বাইয়িনাত।” “বাইয়িনাত” হলো “বাইয়িনা”-র বহুবচন, অর্থ সুস্পষ্ট নিদর্শন বা বৈশিষ্ট্য। এখানে ঠিক কী দেওয়া হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি; আরবি ভাষার রীতি অনুযায়ী কেবল বৈশিষ্ট্যটি উল্লেখ করায় অর্থ ব্যাপক হয়ে যায়। তাই মুফাসসিরগণ এর মধ্যে দলিল-প্রমাণ, নিদর্শনাবলি এবং ইঞ্জিলের আয়াত—সবকিছুকেই অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিদর্শনগুলোর মধ্যে ছিল তাঁর অলৌকিক জন্ম, মায়ের কোলে থাকা অবস্থায় কথা বলা, আল্লাহর অনুমতিক্রমে মৃতকে জীবিত করা এবং জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করা।

সবশেষে “ওয়া আইয়্যাদনাহু বিরূহিল কুদুস।” “আইয়্যাদা” অর্থ সাহায্য বা শক্তিদান করা। এখানে “আমরা” শব্দটি বহুত্ব বোঝায় না, বরং আল্লাহর মহিমা ও কর্তৃত্ব নির্দেশ করে। “রূহুল কুদুস” নিয়ে মুফাসসিরগণের দুটি প্রধান ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথম মত অনুযায়ী “রূহ” দ্বারা জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-কে বোঝানো হয়েছে; আর “কুদুস” অর্থ পবিত্রতা, ফলে অর্থ দাঁড়ায় “পবিত্র আত্মা।” দ্বিতীয় মত অনুযায়ী “কুদ্দুস” আল্লাহর একটি নাম, সেক্ষেত্রে অর্থ হবে পবিত্র সত্তা আল্লাহর সৃষ্ট রূহ। জিবরীলকে “রূহ” বলার কারণ, আত্মা যেমন মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চার করে, তেমনি জিবরীল যে ওহী নিয়ে আসেন তা কুফরের কারণে মৃত অন্তরকে ঈমানের জীবন দান করে; এ জন্য ওহীকেও “রূহ” বলা হয়। আর তিনি পবিত্র, কারণ ফেরেশতারা আল্লাহর অবাধ্য হন না, এবং জিবরীল তাঁদের নেতা।

এই সমগ্র ভূমিকার একটি সূক্ষ্ম কারণ আছে। এখানে প্রচ্ছন্নভাবে হিংসার (হাসাদ) রোগটির চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে—যা এই তিন রোগের তৃতীয়টি। বনু ইসরাইল এই ভেবে হিংসা করত যে দ্বীনি নেয়ামত কেন তাদের ছেড়ে অন্যদের কাছে গেল; বিশেষত শেষ নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কেন ইসমাইল (আলাইহিস সালাম)-এর বংশে, আরবদের মধ্যে এলেন। এই হিংসার জবাবেই আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন—তোমাদের প্রতি দ্বীনি অনুগ্রহের কোনো কমতি রাখা হয়নি: মূসাকে কিতাব, একের পর এক রাসূল, ঈসাকে সুস্পষ্ট নিদর্শন। উল্লেখ্য, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ পাঁচজন শ্রেষ্ঠ রাসূল—নূহ, ইব্রাহিম, মূসা, ঈসা ও মুহাম্মদ (আলাইহিমুস সালাম)—এর মধ্যে দুজন, মূসা ও ঈসা, এসেছিলেন বনু ইসরাইলের মধ্য থেকেই। তাই তাদের হিংসার কোনো ভিত্তিই ছিল না।

প্রথম রোগ: প্রবৃত্তির অনুসরণ (ইত্তিবাউল হাওয়া)

ভূমিকার পর আল্লাহ প্রশ্নের ভঙ্গিতে মূল রোগটি তুলে ধরছেন: “আফা কুল্লামা জা-আকুম রাসূলুম বিমা লা তাহ্‌ওয়া আনফুসুকুমুস্‌তাকবারতুম।” “হাওয়া” শব্দের অর্থ প্রবৃত্তি বা মনের খেয়ালখুশি। বক্তব্যটি এই—যখনই কোনো রাসূল এমন কোনো বিধান নিয়ে এসেছেন যা তাদের প্রবৃত্তির সাথে মেলেনি, তখনই তারা অহংকারবশত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। অর্থাৎ বিধান গ্রহণ বা বর্জনের মাপকাঠি সত্য নয়, বরং নিজের মনে ভালো লাগা না-লাগা।

এরপর “ফাফারীকান কায্‌যাবতুম ওয়া ফারীকান তাক্‌তুলূন।” এখানে একটি সূক্ষ্ম ব্যাকরণগত বিষয় আছে। “কায্‌যাবতুম” (মিথ্যাবাদী বলেছ) অতীতকালে বলা হলেও “তাক্‌তুলূন” (হত্যা করছ) বর্তমান কালে বলা হয়েছে। ভাষাবিদগণ বলেন, শ্রোতা ও পাঠকের দৃশ্যপটে এই ভয়ানক দৃশ্যটি জীবন্ত করে তোলার জন্যই বর্তমান কাল ব্যবহৃত হয়েছে। আমরাও বাংলায় ভবিষ্যতের কোনো দৃশ্যকে জীবন্ত করতে বর্তমান কাল ব্যবহার করি—জাহান্নাম বা জান্নাতের বর্ণনা যখন “আপনি আগুনে পুড়ছেন” বা “ফলের ডাল নিচু হয়ে হাতের কাছে আসছে” বলে দেওয়া হয়, তখন কল্পনা প্রবল হয়। নবীদের হত্যা এমনই বীভৎস কাজ যে আল্লাহ তা যেন আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরছেন।

এই আয়াত থেকে যে রোগটি আমরা পেলাম তা প্রবৃত্তির অনুসরণ। কারও গ্রহণ-বর্জনের মূল মাপকাঠি যদি হয় নিজের কাছে কী ভালো লাগে বা লাগে না, তাহলে সে নিঃসন্দেহে পথভ্রষ্ট হবে। এই কারণেই মনের খেয়ালখুশিকে দোষারোপ করে কুরআনে বহু আয়াত এসেছে।

أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ

“তবে কি আপনি তাকে দেখেছেন, যে তার প্রবৃত্তিকে নিজের ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে?” (সূরা আল-জাসিয়া, ৪৫ঃ২৩)। অর্থাৎ প্রবৃত্তিকে চূড়ান্ত মাপকাঠি বানানো একপ্রকার প্রবৃত্তিকেই উপাস্য বানানো।

রোগের স্তরসমূহ

প্রবৃত্তির তাড়নায় পাপ করার কয়েকটি স্তর আছে। আয়াতে বর্ণিত বনু ইসরাইলের অবস্থা চূড়ান্ত স্তরের; কিন্তু আমাদের অনেকেই এর মৃদু স্তরে অবস্থান করছি, আর সেখান থেকেই ধাপে ধাপে চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছে যাওয়া বিচিত্র নয়।

প্রথম স্তর তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর, এবং এখানেই চিকিৎসার আসল সময়। এই স্তরে মানুষ প্রবৃত্তির তাড়নায়, কিংবা বন্ধু বা পরিবারের প্রতি ভালোবাসার টানে কোনো হারাম কাজে জড়িয়ে পড়ে, কিন্তু সে জানে ও স্বীকার করে যে কাজটি হারাম; তার মধ্যে অনুশোচনা থাকে, সে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করে না। প্রবৃত্তির অনুসরণের বিষ তখনো তার আকিদা ও ঈমানকে গ্রাস করেনি, কেবল দুর্বল করেছে। এই স্তরেই তা দমন করা জরুরি।

দ্বিতীয় স্তরে সে ওই কাজের নিষিদ্ধতাকে অস্বীকার করতে শুরু করে অথবা কাজটিকে জায়েজ প্রমাণের যুক্তি খাড়া করে। যেমন কেউ বলল, “সুদ নিষিদ্ধ ঠিকই, কিন্তু আধুনিক ব্যাংক যে সুদ দেয় তা কুরআনের সুদ নয়; কুরআন কেবল অতিরিক্ত হারে বা চক্রবৃদ্ধি হারে নেওয়া সুদকে নিষেধ করেছে।” অথচ কুরআন যেকোনো পরিমাণ সুদকেই ত্যাগ করতে বলেছে—”হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও” (সূরা আল-বাকারা, ২ঃ২৭৮)। এই স্তরের বিপদ হলো, প্রথম স্তরে যেখানে গুনাহের স্বীকৃতি ও অনুশোচনা ছিল, এখানে নিজের প্রয়োজনকে বৈধ প্রমাণের তাগিদে সে ভুল যুক্তি নির্মাণ করে।

তৃতীয় স্তরে মানুষ আরও এগিয়ে গিয়ে হাদিসকেই অস্বীকার করতে শুরু করে—”আমি হাদিস মানি না, শুধু কুরআন মানি।” অথচ যে হাদিস অস্বীকার করে, সে প্রকৃতপক্ষে কুরআনকেই অস্বীকার করছে; কারণ কুরআন নিজেই রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে।

চতুর্থ ও চূড়ান্ত স্তরে সে একসময় কুরআনকেও প্রত্যাখ্যান করে বসে। বনু ইসরাইল তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণে ঠিক এই মারাত্মক পর্যায়েই পৌঁছেছিল, যার ফলে তারা নবীদের অস্বীকার ও হত্যা পর্যন্ত করেছে। এ কারণেই প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে নিজেদের রক্ষা করা অপরিহার্য।

প্রবৃত্তির চিকিৎসা

আলিমগণের আলোচনা থেকে, বিশেষত ইবনুল কাইয়িম (রহিমাহুল্লাহ)-এর বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে, প্রবৃত্তি দমনের কয়েকটি কার্যকর নীতি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

প্রথম নীতি হলো, আল্লাহ যখন কোনো কিছুকে হারাম করেন, তখন তার একটি হালাল বিকল্পও দিয়ে দেন। ইসলাম প্রবৃত্তিকে শতভাগ দমন করতে বলে না, কারণ তা অসম্ভব; বরং তাকে বৈধ পথে পরিচালিত করে। এর সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত বিবাহ। জৈবিক তাড়না মানুষের স্বভাবজাত; ইসলাম তা দমন করতে বলে না, বরং গাইডলাইন মেনে বিবাহের মাধ্যমে তা পূরণের উৎসাহ দেয়। যারা এই স্বভাবজাত তাড়নাকে সম্পূর্ণ দমন করতে সন্ন্যাসব্রত আবিষ্কার করেছে, কুরআন নিজেই সেটিকে অননুমোদিত উদ্ভাবন বলে চিহ্নিত করেছে—”আর সন্ন্যাসব্রত, তা তো তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছিল, আমি তাদের উপর তা ফরজ করিনি” (সূরা আল-হাদীদ, ৫৭ঃ২৭)। এমন অননুমোদিত পথে স্বভাবকে দমন করতে গেলে তা টেকে না। অপরদিকে হালাল বিবাহ দায়িত্ব ও পারিবারিক বন্ধনের ভেতরে এই তাড়নাকে পূরণ করে, যা ব্যভিচারের দায়িত্বহীন ভোগের সম্পূর্ণ বিপরীত।

এই হালাল বিকল্পের নীতি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। জাহিলি যুগে মানুষ কোনো কাজের শুভ-অশুভ জানতে “ইসতিকসাম বিল-আজলাম”—তীর বা লটারির মাধ্যমে ভাগ্য নির্ণয় করত; আল্লাহ তা নিষিদ্ধ করে এর বিকল্প হিসেবে ইসতিখারা দিয়েছেন—দুই রাকাত সালাত আদায় করে আল্লাহর কাছে দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণের দিকে পরিচালিত হওয়ার দোয়া করা। খাদ্যের ক্ষেত্রেও শূকরের মতো অল্প কিছু নিষিদ্ধ, কিন্তু গরু, ছাগল, মুরগিসহ বহু হালাল ও উপাদেয় বিকল্প উন্মুক্ত—হারামের সংখ্যা কম, হালাল বিকল্প বেশি। শিশুদের, বিশেষত ছেলেদের, স্বভাবজাত শারীরিক শক্তি ও চঞ্চলতাকেও দমন না করে বৈধ খেলাধুলার (যেমন মার্শাল আর্ট, তবে অ-ইসলামিক আচার-অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে) মাধ্যমে পরিচালিত করা উচিত; স্বভাবকে রুদ্ধ করলে তা অন্যত্র বিকৃতভাবে প্রকাশ পায়।

দ্বিতীয় নীতি হলো, আখিরাত ও মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের বিবরণ নিয়মিত পাঠ করা; এটি প্রবৃত্তি দমনে অত্যন্ত কার্যকর।

তৃতীয় নীতি হলো সঠিক প্রাত্যহিক রুটিন। আগে ঘুমানো, ভোরে উঠে ফজরের সালাত আদায় করা, দিনের প্রথম ভাগে কাজ করা—এই ইসলামি অভ্যাসগুলো প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক।

চতুর্থ নীতি হলো নিজেকে দোষারোপ ও শাসন করা। শরীয়তের কোনো বিধান অপছন্দ মনে হলে বলা যাবে না “এই বিধান কেন দেওয়া হলো”; বরং মানতে হবে যে বিধান নিখুঁত ও কল্যাণকর, ত্রুটি আমার নিজের দুর্বলতায়। তাই দোষটা শরীয়তকে নয়, নিজেকে দিতে হবে।

পঞ্চম নীতি হলো ইবাদত—ফরজের পাশাপাশি নফল ইবাদতেও নিয়মিত হওয়া।

ষষ্ঠ নীতি হলো উপকারী জ্ঞান ও সৎসঙ্গ। উপকারী জ্ঞান অর্জনে সময় দেওয়া এবং ভালো মানুষের সাহচর্যে থাকা প্রবৃত্তিকে সংযত রাখে।

সপ্তম নীতি হলো আল্লাহর উপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) এবং নিয়মিত তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা (ইসতিআনা) করা।

অষ্টম নীতি হলো তাদাব্বুরসহ নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত। কেবল সুরেলা মৌখিক তিলাওয়াতে সীমাবদ্ধ না থেকে অর্থ বুঝে তিলাওয়াত করলে অন্তরে গভীর প্রভাব পড়ে; “প্রত্যেক প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে”-এর মতো আয়াতের অর্থ যখন হৃদয়ে জাগরূক থাকে, তখন অন্তরের বহু অন্যায় প্রবৃত্তি ধুয়েমুছে যায়।

এই নীতিগুলোর সাথে একটি ব্যবহারিক সতর্কতাও যুক্ত—প্রবৃত্তি যেসব পরিস্থিতিতে প্ররোচিত হয়, সেসব পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা। যেসব সঙ্গ বা আসরে আল্লাহ ও রাসূলের স্মরণ থাকে না, বরং ঈমান দুর্বল হয় এবং ধূমপান, জুয়া বা অন্যান্য পাপে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, সেগুলো এড়িয়ে হালাল বিকল্প বেছে নেওয়া উচিত—যেমন গানের পরিবর্তে সুন্দর কুরআন তিলাওয়াত শোনা।

সংশ্লিষ্ট রোগ: অহংকার (ইস্তিকবার)

আয়াতে প্রবৃত্তির অনুসরণের সাথে সাথে “ইসতাকবারতুম”—অর্থাৎ অহংকারের কথাও এসেছে। শরীয়তের বিধান প্রবৃত্তির সাথে না মেলায় বনু ইসরাইলের অহংকারী প্রতিক্রিয়াই তাদের প্রত্যাখ্যান ও হত্যার পথে নিয়ে গিয়েছিল। অহংকার এই তিন রোগের দ্বিতীয়টি; এর বিস্তারিত আলোচনা স্বতন্ত্রভাবে দীর্ঘ বলে তা পরবর্তী আলোচনার জন্য রাখা হলো। এখানে মূল শিক্ষা এই যে, প্রবৃত্তির অনুসরণকে মৃদু স্তরেই দমন করতে হবে, যেন তা অহংকারের পর্যায়ে না পৌঁছায়।

শিক্ষা

এই আয়াত আমাদের শেখায় যে অন্তরের রোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছার আগেই তা চিনে নিয়ে চিকিৎসা করতে হবে। প্রবৃত্তির অনুসরণ এমন এক রোগ, যা প্রথমে ঈমানকে দুর্বল করে এবং ধাপে ধাপে অস্বীকার ও যুক্তিসাজানোর মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত পথভ্রষ্টতায় পৌঁছায়। গ্রহণ ও বর্জনের মাপকাঠি কখনোই নিজের ভালো লাগা না-লাগা হতে পারে না; মাপকাঠি হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ। কোনো গুনাহ হয়ে গেলে আমরা নিজেকে দোষারোপ করব, তওবা করব এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসব, কিন্তু কখনোই শরীয়তের বিরোধিতা করব না কিংবা নিজের অন্যায়কে জায়েজ প্রমাণের চেষ্টা করব না। আল্লাহ যেহেতু প্রতিটি নিষিদ্ধ বিষয়ের হালাল বিকল্প রেখে দিয়েছেন, তাই প্রবৃত্তিকে দমন নয়, বরং বৈধ পথে পরিচালিত করাই মুক্তির উপায়। আর এই সমস্ত রোগের মূল প্রতিষেধক হলো অর্থ বুঝে, তাদাব্বুরসহ কুরআনের সাথে জীবন্ত সম্পর্ক গড়ে তোলা।