সূরা আল-বাকারা ২ঃ৪৭ — বনু ইসরাইলের ঘটনাপ্রবাহ: একটি পটভূমি

তাফসীরের এই যাত্রায় আমরা সূরা আল-বাকারার ৪৭ নম্বর আয়াতে এসে পৌঁছেছি — যেখান থেকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বর্তমান মুসলিম উম্মাহর পূর্ববর্তী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উম্মাত বনু ইসরাইলকে সম্বোধন করে একের পর এক আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। সামনের আয়াতগুলোতে ফেরাউন, মুসা আলাইহিস সালাম, সাগর বিদারণ, স্বর্ণের বাছুর — এমন অনেক ঘটনার ইঙ্গিত আসবে। কিন্তু আল কোরআন এসব ঘটনার বিস্তারিত ঐতিহাসিক বিবরণ দেয় না; তাই আয়াতগুলোর তাফসীরে প্রবেশের আগে গোটা ঘটনাপ্রবাহের একটি দৃশ্যপট সামনে থাকা দরকার। এই পাঠে সেই পটভূমিটাই ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো।

يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اذْكُرُوا نِعْمَتِيَ الَّتِي أَنْعَمْتُ عَلَيْكُمْ وَأَنِّي فَضَّلْتُكُمْ عَلَى الْعَالَمِينَ

Yā banī Isrāʾīla-dhkurū niʿmatiya-llatī anʿamtu ʿalaykum wa annī faddaltukum ʿala-l-ʿālamīn

“হে ইসরাইলের বংশধর, আমার সেই নিয়ামত স্মরণ করো যা আমি তোমাদের দিয়েছি, এবং (স্মরণ করো) আমি তোমাদের সমগ্র জগতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিলাম।”

ঘটনার উদ্দেশ্য: ইতিহাস নয়, শিক্ষা

উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি মর্মার্থ এখানে গুরুত্বপূর্ণ: আল্লাহ যখন বনু ইসরাইলকে সম্বোধন করছেন, তারা এমন এক জাতি যাদের মূল ঘটনাগুলো ঘটেছিল বহু আগে এবং সেই লোকেরা চলে গেছে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর দ্বারা উদ্দেশ্য আমরাই। অর্থাৎ এসব বিবরণ কেবল ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহের বিষয় নয় — এ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে।

এ কারণেই একটি লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, আল কোরআন ও হাদিসে এসব ঘটনার ঐতিহাসিক তথ্য খুবই সংক্ষিপ্ত। কারণ ঘটনা বর্ণনার উদ্দেশ্য ইতিহাস শেখানো নয়, বরং পূর্ববর্তী জাতিদের ভুলগুলো আমাদের সামনে তুলে ধরা — যেন একই ভুল আমরা না করি। ঘটনার এই ফাঁকগুলো বোঝার জন্য মুফাসসিরগণ ইসরাইলিয়াতের সাহায্য নিয়েছেন।

ইসরাইলিয়াত ব্যবহারের নীতি

সামনের বহু বিবরণের উৎস হলো ইসরাইলিয়াত — বনু ইসরাইলের কাছ থেকে প্রাপ্ত বর্ণনা — যা সাহাবা ও তাবিয়ীন থেকে শুরু করে ইমাম তবারি, ইবনু কাসীর, কুরতুবিসহ পরবর্তী মুফাসসিরগণ তাঁদের তাফসীরে এনেছেন। এটি কোনো বিদআত নয়; তবে পথভ্রষ্ট না হওয়ার জন্য এর ব্যবহারে তিনটি নীতি মনে রাখা জরুরি।

প্রথমত, ইসরাইলিয়াত বর্ণনা করা বৈধ; সালাফ ও পরবর্তী মুফাসসিরগণ তা বর্ণনা করেছেন, এতে কোনো দোষ নেই। দ্বিতীয়ত, প্রমাণ ছাড়া এগুলোকে সত্য বা মিথ্যা কোনোটাই বলা যাবে না — যদি কোনো বর্ণনা কোরআন-হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবে তা মিথ্যা, যদি মিলে যায় তবে সত্য, আর যদি কোনোটাই না হয় তবে এর সত্য-মিথ্যা সম্পর্কে চুপ থাকতে হবে, যদিও বর্ণনা করা যায়। তৃতীয়ত, এর ফায়দা হলো, সাংঘর্ষিক নয় এমন বর্ণনাগুলো ঘটনার শূন্যস্থান পূরণ করে পুরো চিত্রটি বুঝতে সহজ করে দেয়।

সুতরাং নিচের ঘটনাপ্রবাহে যেসব বিবরণ কেবল ইসরাইলিয়াত থেকে আসছে, সেগুলো এই নীতির আলোকেই গ্রহণ করতে হবে — নিশ্চিত সত্য হিসেবে নয়।

বনু ইসরাইল ও মিশরে হিজরত

বনু ইসরাইল কারা, তা সংক্ষেপে স্মরণ করা যাক। ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের দুই ছেলে ইসমাইল ও ইসহাক — উভয়েই নবী। ইসহাক আলাইহিস সালামের ছেলে ইয়াকুব আলাইহিস সালামও নবী, যাঁর উপাধি ইসরাইল — আল্লাহর অনুগত সৎকর্মশীল বান্দা। তাঁর বারো সন্তান ও তাঁদের বংশধরই বনু ইসরাইল, আর এখান থেকেই তাদের বারোটি গোত্র। এই বারো সন্তানের একজন ইউসুফ আলাইহিস সালাম।

ইউসুফ আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে তাঁর ভাইয়েরা ষড়যন্ত্র করে তাঁকে কুয়ায় ফেলে দেয়; একটি কাফেলা তাঁকে তুলে নিয়ে দাস হিসেবে মিশরে নিয়ে যায়। সেখানে আল্লাহ তাঁকে এমন ক্ষমতাধর পদে অধিষ্ঠিত করেন যাঁকে একভাবে খাদ্যভান্ডার ও অর্থব্যবস্থার দায়িত্বশীল বলা যায়। উল্লেখ্য, সূরা ইউসুফে তখনকার রাষ্ট্রপ্রধানকে “মালিক” (রাজা) বলা হয়েছে, “ফেরাউন” নয় — ঐতিহাসিকদের মতে মিশরের শাসকের উপাধি হিসেবে “ফেরাউন” নামটি পরবর্তীকালে এসেছে। মানুষ ইউসুফ আলাইহিস সালামকে গভীরভাবে ভালোবাসত এবং তাঁর কর্তৃত্ব মেনে নিয়েছিল।

পরবর্তীতে দুর্ভিক্ষের সময় ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইয়েরা খাদ্যের সন্ধানে মিশরে আসে, এবং শেষ পর্যন্ত তারা তাঁকে চিনতে পারে। ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাদের ক্ষমা করে দেন এবং সবাইকে মিশরে নিয়ে আসতে বলেন। এভাবে ইয়াকুব আলাইহিস সালাম, তাঁর পরিবার ও গোটা বংশ মিশরে হিজরত করে — এটিই বনু ইসরাইলের মিশরে প্রতিষ্ঠার সূচনা। তবে ইউসুফ আলাইহিস সালাম ক্ষমতায় থাকলেও মিশরের সবাই ঈমান আনেনি; ফলে মিশরে পাশাপাশি দুটি জাতি বাস করত — মূল মিশরীয়রা, যাদের অধিকাংশ ছিল অবিশ্বাসী, আর সংখ্যালঘু বনু ইসরাইল।

ফেরাউন: উপাধি, নির্যাতন ও নেতৃত্বের সূত্র

প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা দরকার: “ফেরাউন” কোনো ব্যক্তির নাম নয়, বরং প্রাচীন মিশরের অবিশ্বাসী শাসকদের উপাধি। আজকের আয়াতে যে ফেরাউনের কথা আসবে, সে সেই ফেরাউন যে মুসা আলাইহিস সালামের সমসাময়িক ছিল এবং যাকে আল্লাহ দলবলসহ সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। বস্তুত মুসা আলাইহিস সালামকে শিশু অবস্থায় যে ফেরাউনের পরিবার নীল নদ থেকে তুলে নিয়েছিল, আর যার সময়ে মুসা আলাইহিস সালাম নবুয়ত লাভ করেন — এই দুই ফেরাউন সম্ভবত অভিন্ন নয়। এসব বিস্তারিত কোরআনে নেই, কারণ শিক্ষণীয় বিষয়ের সামনে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়।

মুসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামের জন্মের সময় মিশরের শাসকদের উপাধি ছিল ফেরাউন, এবং ফেরাউনরা বনু ইসরাইলের উপর ভয়ানক নির্যাতন চালাত — তাদের দিয়ে অত্যন্ত কঠোর কায়িক পরিশ্রম করানো হতো এবং নানাভাবে নিপীড়িত রাখা হতো।

এর পেছনে একটি বড় সূত্র রয়েছে। ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের বংশে নবী-রাসূল আসতে থাকবেন — এটি আল্লাহর প্রতিশ্রুতি; এই ধারায় ধর্মীয় নেতৃত্ব থাকবে নবীদের হাতে, আর তাঁদের পাশাপাশি রাষ্ট্রক্ষমতা থাকবে সৎকর্মশীল রাজা-বাদশাদের হাতে (সূরা বাকারায় যেমন তালুতের উল্লেখ আসবে)। এই নেতৃত্ব ততক্ষণই অব্যাহত থাকে যতক্ষণ তারা সৎ থাকে; যখন তারা অন্যায়ে লিপ্ত হয়, তখন অন্য জাতি তাদের উপর প্রবল হয়ে ওঠে। বনু ইসরাইলের ক্ষেত্রেও তাই — তাদের পাপের কারণেই ফেরাউন তাদের উপর চড়াও হয়েছিল, আর এই নীতি আমাদের ক্ষেত্রেও সত্য। তবু আল্লাহ তাদের প্রতি অনুগ্রহ থেকে নবী-রাসূল পাঠানো বন্ধ করেননি; নবীরা তাদের পথ দেখিয়েছেন ও সংশোধন করেছেন, আর সৎকর্মশীল রাজাদের মাধ্যমে আল্লাহ আবার তাদের বিজয় দান করেছেন।

পতনের ভবিষ্যদ্বাণী ও শিশুহত্যার নির্দেশ

ইসরাইলিয়াতের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, ফেরাউন কোনোভাবে জানতে পারে যে বনু ইসরাইলের এক শিশুর হাতে তার রাজত্বের পতন ঘটবে; এই সংবাদ সম্ভবত এসেছিল জ্যোতিষী-গণকদের মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে একটি বিষয় বোঝা দরকার: গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই — এটি আমাদের আকিদা। তবে আল্লাহ যখন ফেরেশতাদের মাধ্যমে পৃথিবীতে কিছু ঘটান, তখন ফেরেশতাদের সেই আলোচনার কিছু অংশ জিনেরা চুরি করে গণকদের কানে পৌঁছে দিত; অতীতে এভাবে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়ে যেত। কিন্তু আল কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় আল্লাহ আসমানকে সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত করেন — কোনো জিন সংবাদ শুনতে গেলে উল্কা নিক্ষেপে তাকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। জিব্রাইল আলাইহিস সালাম, যিনি “শাদীদুল কুওয়া” অর্থাৎ অত্যন্ত শক্তিধর, তিনিই কোরআন নিয়ে এসেছেন; তাই কোনো জিন-শয়তানের পক্ষে কোরআনের কোনো অংশ আগে ফাঁস করে দেওয়া অসম্ভব ছিল। এরপর থেকে গণকদের ভবিষ্যদ্বাণী মেলার হার অনেক কমে যায়।

যাই হোক, এই আশঙ্কায় ফেরাউন নির্দেশ দিল — বনু ইসরাইলের নবজাতক পুত্রদের হত্যা করো, কন্যাদের বাঁচিয়ে রাখো। কিছুদিন পর আরেকটি বিবেচনা সামনে আসে: এভাবে চললে পুরুষশ্রমিকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে, তখন কঠোর কায়িক পরিশ্রমের কাজ করবে কে? ইসরাইলিয়াত বর্ণনা অনুযায়ী তখন সিদ্ধান্ত হয় — এক বছর নবজাতকদের হত্যা করা হবে, পরের বছর ছেড়ে দেওয়া হবে। হারুন আলাইহিস সালামের জন্ম হয় সেই বছরে যে বছরে কাউকে হত্যা করা হচ্ছিল না, তাই তিনি রক্ষা পান; আর মুসা আলাইহিস সালামের জন্ম হয় হত্যার বছরে।

মুসা আলাইহিস সালামের জন্ম ও মায়ের প্রতি ওহী

মুসা আলাইহিস সালামের জন্মের পর আল্লাহ তাঁর মায়ের প্রতি ওহী প্রেরণ করেন:

وَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ أُمِّ مُوسَىٰ أَنْ أَرْضِعِيهِ ۖ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَأَلْقِيهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي ۖ إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ

Wa awhaynā ilā ummi Mūsā an ardiʿīhi, fa-idhā khifti ʿalayhi fa-alqīhi fi-l-yammi wa lā takhāfī wa lā tahzanī, innā rāddūhu ilayki wa jāʿilūhu mina-l-mursalīn

“আমি মুসার মায়ের প্রতি ইঙ্গিত পাঠালাম: তুমি তাকে দুধ পান করাও; আর যখন তার ব্যাপারে ভয় করবে, তখন তাকে দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও, আর ভয় করো না, দুঃখও করো না; নিশ্চয়ই আমি তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে রাসূলদের একজন করব।”

একজন মায়ের পক্ষে তাঁর দুধের শিশুকে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া কত কঠিন — অথচ আল্লাহ কী দৃঢ় আশ্বাস দিচ্ছেন: ভয় কোরো না, দুঃখ কোরো না, আমি তাকে ফিরিয়ে দেব। “ইন্না রাদ্দূহু ইলাইকি” বাক্যটিতে যে দৃঢ়তা ও কর্তৃত্ব রয়েছে, তা আরবি-জানা ব্যক্তি অনুভব করতে পারবেন। এই “ওহী” প্রসঙ্গে আলেমদের কয়েকটি মত রয়েছে — কারো মতে এটি অন্তরে আসা ইলহাম, কারো মতে ফেরেশতার মাধ্যমে প্রেরিত বার্তা (কারণ ফেরেশতা কেবল নবীদের কাছে নয়, অন্যদের কাছেও আসতে পারেন, যেমন মারিয়াম আলাইহাস সালামের কাছে জিব্রাইল এসেছিলেন)। যেভাবেই হোক, এর অর্থ এই নয় যে মুসা আলাইহিস সালামের মা নবী ছিলেন — নারীদের মধ্যে কেউ নবী ছিলেন না; ওহী আসা মানেই নবী হয়ে যাওয়া নয়।

শিশু মুসা ভাসতে ভাসতে গিয়ে পৌঁছান ফেরাউনেরই প্রাসাদে। ফেরাউনের স্ত্রী তাঁকে তুলে নেন এবং ফেরাউনকে অনুরোধ করেন যেন তাঁকে হত্যা না করা হয় — বরং তিনি তাদের চোখের শীতলতা হবেন, তাঁরা তাঁকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করবেন। তারা এর পরিণতি জানত না। দেখুন আল্লাহর সিদ্ধান্ত: যে শিশুর হাতে ফেরাউনের পতন হবে, সেই শিশুকেই আল্লাহ ফেরাউনের রাজকীয় নিরাপত্তা ও পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত করার ব্যবস্থা করলেন। অথচ ফেরাউন কেবল এই একটি শিশুর হাত থেকে বাঁচার জন্যই অসংখ্য নবজাতককে হত্যা করেছিল।

মুসা আলাইহিস সালাম কোনো ধাত্রীর দুধ পান করছিলেন না। এই সুযোগে তাঁর বোন — যাঁকে মা পাঠিয়েছিলেন শিশুটির খোঁজ রাখতে — এসে জানায় যে সে এমন এক পরিবারের কথা জানে যারা শিশুটিকে দুধ পান করাতে পারবে। এভাবে মুসা আলাইহিস সালাম তাঁর নিজের মায়ের কাছেই ফিরে আসেন এবং তাঁর দুধ পান করেন — আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করলেন।

হত্যা, মাদিয়ানে হিজরত ও নবুয়ত

যৌবনে মুসা আলাইহিস সালাম একদিন এক বনু ইসরাইলি ও এক মিশরীয়র মধ্যে বিবাদ দেখতে পান। বনু ইসরাইলি লোকটিকে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি মিশরীয়কে একটি ঘুষি মারেন, আর তাতেই সে মারা যায় — মুসা আলাইহিস সালাম অত্যন্ত শক্তিশালী ছিলেন। তিনি হত্যা করতে চাননি, তবু কাজটি ঠিক হয়নি; তাই তিনি তওবা করেন এবং আল্লাহ তাঁর তওবা কবুল করেন। এই ঘটনায় ফেরাউনের লোকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকে।

প্রাণভয়ে মুসা আলাইহিস সালাম মিশর ছেড়ে মাদিয়ান অঞ্চলে চলে যান (স্থানটি সম্ভবত বর্তমান সৌদি আরবের সীমানায় পড়ে)। সেখানে তিনি বিবাহ করেন, এবং পরে যখন মিশরের পথে ফিরছিলেন, তখন আল্লাহ তাঁর সাথে কথা বলেন ও তাঁকে নবুয়ত দান করেন। এবার তাঁকে পাঠানো হয় ফেরাউনের মতো কঠিনতম মানুষকে দাওয়াত দেওয়ার জন্য। মুসা আলাইহিস সালাম দোয়া করেন যেন তাঁর ভাই হারুনকেও নবী করা হয়, আর সেই দোয়ায় হারুন আলাইহিস সালাম নবুয়ত লাভ করেন — আলেমরা বলেন, ভাইয়ের দোয়ায় এক ভাইয়ের সর্বোচ্চ কল্যাণ লাভের উদাহরণ এটি।

দাওয়াত, সাগর বিদারণ ও ফেরাউনের ধ্বংস

মিশরে ফিরে মুসা আলাইহিস সালাম ফেরাউনকে দাওয়াত দেন, কিন্তু সে তা প্রত্যাখ্যান করে। মুসা আলাইহিস সালাম নিদর্শন দেখান — লাঠি সাপে পরিণত হওয়া, হাত উজ্জ্বল হয়ে ওঠা, এবং আরও অনেক নিদর্শন। সাপের নিদর্শন দেখে ফেরাউনের জাদুকরদের প্রধানরা পর্যন্ত ঈমান আনে; ফেরাউন তাদের হত্যা করে এবং বনু ইসরাইলের উপর নির্যাতন আরও বাড়িয়ে দেয়।

মুসা আলাইহিস সালাম বারবার বনু ইসরাইলকে মুক্ত করার দাবি জানালেও ফেরাউন রাজি হয় না। শেষে আল্লাহর নির্দেশে মুসা আলাইহিস সালাম রাতের অন্ধকারে বনু ইসরাইলকে নিয়ে মিশর থেকে বেরিয়ে পড়েন এবং লোহিত সাগরের তীরে পৌঁছান। সামনে সাগর, পেছনে ফেরাউনের ধাওয়া করা বাহিনী। এই সংকটে আল্লাহর আদেশে মুসা আলাইহিস সালাম লাঠি দিয়ে আঘাত করেন, আর সাগর ভাগ হয়ে বারো গোত্রের জন্য বারোটি পথ তৈরি হয়ে যায়। (এ প্রসঙ্গে আলেমদের একটি সুন্দর উক্তি আছে — পৃথিবীতে একটিমাত্র স্থান আছে যেখানে মাত্র একবার, কিছুক্ষণের জন্য সূর্যের আলো পৌঁছেছিল: লোহিত সাগরের সেই তলদেশ, যেখান থেকে আল্লাহ সাময়িকভাবে পানি সরিয়ে দিয়েছিলেন।)

বনু ইসরাইল পার হয়ে গেলে ফেরাউন ও তার বাহিনী সাগরের সেই পথে ঢুকে পড়ে। (ইসরাইলিয়াত বর্ণনা অনুযায়ী, ফেরাউনের ঘোড়া নামতে দ্বিধা করছিল; তখন জিব্রাইল আলাইহিস সালাম একটি স্ত্রী-ঘোড়া নিয়ে আসেন এবং তার পিছু নিয়ে ফেরাউনের ঘোড়াসহ গোটা বাহিনী সাগরে নেমে পড়ে।) সবাই ঢুকে যাওয়ার পর ও বনু ইসরাইল নিরাপদে বেরিয়ে আসার পর মুসা আলাইহিস সালাম আবার আঘাত করেন; পানি আগের অবস্থায় ফিরে আসে এবং ফেরাউন ও তার বিশাল বাহিনী ডুবে ধ্বংস হয়ে যায়।

এখানে একটি বিবরণ পরবর্তী ঘটনার জন্য প্রাসঙ্গিক। ইসরাইলিয়াত অনুযায়ী, বনু ইসরাইলের সাথে থাকা সামিরী নামের এক ব্যক্তি (কারো মতে সে মূলত বনু ইসরাইলের ছিল না) কোনোভাবে বুঝতে পারে যে ওই ঘোড়ার আরোহী ছিলেন জিব্রাইল আলাইহিস সালাম। সে জিব্রাইলের ঘোড়ার খুরের চিহ্ন থেকে একটু মাটি তুলে নেয়, এই ভেবে যে এই মাটিতে কোনো বরকত আছে। লক্ষণীয়, “বরকতময় মাটি”র এই ধারণা আমাদের সমাজেও নানা রূপে প্রচলিত। সামিরীর এই মাটিই সামনে এক বড় ফিতনার উপকরণ হবে।

স্বর্ণের বাছুর ও তওবার প্রক্রিয়া

সাগর পার হয়ে বনু ইসরাইল সিনাই অঞ্চলের দিকে পৌঁছায়। এরপর আল্লাহ মুসা আলাইহিস সালামের সাথে তুর পাহাড়ে চল্লিশ দিনের এক অধিবেশন নির্ধারণ করেন, যেখানে তাঁকে তাওরাত দান করা হবে। মুসা আলাইহিস সালাম যাওয়ার সময় হারুন আলাইহিস সালামকে বনু ইসরাইলের দায়িত্বে রেখে যান। মুসা আলাইহিস সালাম ছিলেন দৃঢ় প্রকৃতির, আর হারুন আলাইহিস সালামকে তারা ততটা মানত না।

মিশর থেকে বেরোনোর সময় বনু ইসরাইল মিশরীয়দের কাছ থেকে ধার করা কিছু স্বর্ণালংকার সাথে এনেছিল। এগুলো রাখা বৈধ কি না — এই প্রশ্নে তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে মুসা আলাইহিস সালাম তাওরাতসহ ফিরে এসে যা বলবেন সেটাই হবে, ততক্ষণ অলংকারগুলো গলিয়ে একটি বড় খণ্ড বানিয়ে রাখা হবে। ঠিক এই সময় সামিরী তার সংগ্রহ করা মাটি আগুনে নিক্ষেপ করে; আল্লাহ পরীক্ষাস্বরূপ এমন করলেন যে গলিত স্বর্ণ একটি বাছুরের রূপ ধারণ করল, যা থেকে গরুর মতো ডাক বের হতো (কারো মতে ভেতরটা ফাঁপা ছিল, বাতাস ঢুকে-বেরিয়ে সেই আওয়াজ হতো)। এ ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনা আল্লাহ মানুষের ঈমান পরীক্ষার জন্য ঘটতে দেন, যদিও একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায় এতে বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই।

فَأَخْرَجَ لَهُمْ عِجْلًا جَسَدًا لَّهُ خُوَارٌ فَقَالُوا هَٰذَا إِلَٰهُكُمْ وَإِلَٰهُ مُوسَىٰ فَنَسِيَ

Fa-akhraja lahum ʿijlan jasadan lahu khuwārun fa-qālū hādhā ilāhukum wa ilāhu Mūsā fa-nasiya

“অতঃপর সে তাদের জন্য একটি বাছুর বের করল — একটি দেহ, যার ছিল গরুর মতো ডাক। তারা বলল: এই তোমাদের মাবুদ এবং মুসারও মাবুদ; কিন্তু সে (মুসা) ভুলে গেছে।”

তারা এই বাছুরের পূজায় লিপ্ত হয়ে পড়ল। অথচ সামান্য চিন্তা করলেই বোঝা যেত যে এটি কোনো কথার জবাব দেয় না এবং কারও কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক নয়। ফেরাউনের কবল থেকে এমন অলৌকিকভাবে মুক্তি পাওয়ার পরও, অগণিত নিয়ামত পাওয়ার পরও, প্রথম সুযোগেই আল্লাহকে ভুলে গিয়ে শিরকে লিপ্ত হয়ে যাওয়া — এটি সেই প্রজন্মের হৃদয়ের কাঠিন্যের পরিচায়ক।

এই কঠিন গুনাহের পরও আল্লাহ তাদের ক্ষমা করলেন, তবে গুনাহের গুরুত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এক কঠিন তওবার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে:

وَإِذْ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ إِنَّكُمْ ظَلَمْتُمْ أَنفُسَكُم بِاتِّخَاذِكُمُ الْعِجْلَ فَتُوبُوا إِلَىٰ بَارِئِكُمْ فَاقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ عِندَ بَارِئِكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ ۚ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ

Wa idh qāla Mūsā li-qawmihi yā qawmi innakum zalamtum anfusakum bi-ttikhādhikumu-l-ʿijla fa-tūbū ilā bāriʾikum fa-qtulū anfusakum, dhālikum khayrun lakum ʿinda bāriʾikum fa-tāba ʿalaykum, innahu huwa-t-tawwābu-r-rahīm

“আর স্মরণ করো, যখন মুসা তার জাতিকে বলল: হে আমার জাতি, তোমরা বাছুরকে উপাস্য গ্রহণ করে নিজেদের প্রতি জুলুম করেছ; সুতরাং তোমাদের স্রষ্টার কাছে তওবা করো এবং নিজেদের হত্যা করো — তোমাদের স্রষ্টার কাছে এটাই তোমাদের জন্য উত্তম। অতঃপর তিনি তোমাদের তওবা কবুল করলেন; নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত তওবা-কবুলকারী, পরম দয়ালু।”

নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তারা পরস্পরকে হত্যা করবে — এই ছিল ক্ষমা লাভের প্রক্রিয়া। এতে যারা নিহত হলো তাদের জন্য তা শাহাদাত হিসেবে গণ্য হলো, আর যারা বেঁচে রইল তাদের এই কঠিন গুনাহ থেকে পরিচ্ছন্ন করে ক্ষমা করে দেওয়া হলো। এখান থেকে একটি বড় শিক্ষা: মুমিনের জন্য আসল প্রশ্ন কেবল “মারা গেল কি না” নয়, বরং “ঈমানের উপর মারা গেল কি না”। যারা ঈমানের উপর মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাদের এই পৃথিবীর কষ্ট থেকে চিরমুক্তি দিয়ে অনন্ত সুখ-শান্তির দিকে নিয়ে যান — আখিরাতে বিশ্বাসী হলে তাদের পরিণতি নিয়ে বিষণ্ন হওয়ার কারণ নেই, যদিও ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত।

শিক্ষা

বনু ইসরাইলের এই দীর্ঘ ঘটনাপ্রবাহ ইতিহাসচর্চার জন্য নয়, শিক্ষা গ্রহণের জন্য। আল্লাহ যাদের অগণিত নিয়ামত ও শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলেন, তারাই বারবার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়েছে — আর তাদের ভুলগুলো আমাদের সামনে আয়না হিসেবে রাখা হয়েছে, যেন আমরা একই পথে না চলি। নেতৃত্ব ও মর্যাদা টিকে থাকে সৎকর্মের উপর; অন্যায়ে লিপ্ত হলে সেই মর্যাদা হাতছাড়া হয়ে অন্য জাতি প্রবল হয়ে ওঠে — এই সূত্র প্রতিটি উম্মাহর জন্যই সত্য। আল্লাহর সিদ্ধান্ত অবশ্যম্ভাবী: যে শিশুর হাতে ফেরাউনের পতন লেখা ছিল, তাকেই তিনি ফেরাউনের কোলে লালন করালেন, কারণ তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আর স্বর্ণের বাছুরের ঘটনা মনে করিয়ে দেয় যে সবচেয়ে বড় নিয়ামত পাওয়ার পরও হৃদয় কঠিন হলে মানুষ প্রথম সুযোগেই বিভ্রান্ত হতে পারে; তাই প্রকৃত রক্ষা নিয়ামত-স্মরণ ও কৃতজ্ঞতার মধ্য দিয়ে হৃদয়কে নরম ও অবিচল রাখার মধ্যেই।