সূরা আল-বাকারার তাফসির: বনী ইসরাইলের ইতিহাস, নিয়ামত ও অঙ্গীকার
ভূমিকা
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-বাকারায় মানবজাতির একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে বেশ কিছু আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। এই গোষ্ঠীটি হলো বনী ইসরাইল। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাদেরকে সরাসরি সম্বোধন করে বলেছেন:
“হে বনী ইসরাইল! আমার সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যা আমি তোমাদেরকে দান করেছি এবং তোমরা আমার সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করো, তাহলে আমিও তোমাদের সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করব। আর তোমরা কেবল আমাকেই ভয় করো।” (সূরা আল-বাকারা: ৪০)
বনী ইসরাইল কারা? তাদেরকে কেন বিশেষভাবে সম্বোধন করা হয়েছে এবং তাদের সাথে আল্লাহর সেই অঙ্গীকারটিই বা কী ছিল— তা বুঝতে হলে আমাদেরকে ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হবে।
নবীদের ধারা এবং ‘খলিলুল্লাহ’র মর্যাদা
নবী-রাসূলদের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ নবী ছিলেন ইব্রাহিম (আঃ)। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ দুই নবীর একজন এবং তিনি ছিলেন আল্লাহর ‘খলিল’ বা পরম বন্ধু। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার মাত্র দুজন খলিল রয়েছেন— একজন হলেন ইব্রাহিম (আঃ) এবং অন্যজন হলেন আমাদের শেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ)।
অনেকে না বুঝে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে কেবল ‘আল্লাহর হাবিব’ বলে থাকেন। ‘হাবিব’ অর্থ ভালোবাসার পাত্র, যা একটি সাধারণ পরিভাষা। আল্লাহ তাঁর সকল মুমিন ও মুত্তাকী বান্দাকেই ভালোবাসেন। কিন্তু মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মর্যাদা এর চেয়েও অনেক ঊর্ধ্বে, তিনি আল্লাহর ‘খলিল’ বা বিশেষ ভালোবাসার পাত্র। ইব্রাহিম (আঃ) ছিলেন একত্ববাদীদের (মুওয়াহহিদীন) নেতা। তাওহীদ প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর সংগ্রাম ও ত্যাগের কারণে আল্লাহ তাঁকে বিরাট পুরস্কারে ভূষিত করেন। তাঁর বংশধারায় পরবর্তীতে অসংখ্য নবী-রাসূল দুনিয়ায় আগমন করেন।
বনী ইসরাইলের পরিচয়
ইব্রাহিম (আঃ)-এর পরবর্তী নবী-রাসূলদের একটি বড় অংশ এসেছেন তাঁর ছোট ছেলে ইসহাক (আঃ)-এর বংশে। ফেরেশতাগণ ইব্রাহিম (আঃ)-কে ইসহাক (আঃ) এবং তাঁর সন্তান ইয়াকুব (আঃ)-এর জন্মের সুসংবাদ দিয়েছিলেন।
এই ইয়াকুব (আঃ)-এরই একটি বিশেষ উপাধি ছিল ‘ইসরাইল’। ‘ইসরাইল’ শব্দের অর্থ হলো— আল্লাহর অনুগত ও সৎকর্মশীল বান্দা। ইয়াকুব (আঃ)-এর বংশধরদেরকেই কোরআনের ভাষায় ‘বনী ইসরাইল’ (ইসরাইলের সন্তানাদি) বলা হয়, যাদেরকে আমরা সাধারণভাবে ইহুদি জাতি হিসেবে চিনি।
ইয়াকুব (আঃ)-এর ১২ জন সন্তান ছিলেন। এই ১২ সন্তান থেকেই বনী ইসরাইলের ১২টি গোত্রের উৎপত্তি। এই বংশধারায় অসংখ্য নবী-রাসূল এসেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: ইউসুফ (আঃ), মুসা (আঃ), তাঁর ভাই হারুন (আঃ), দাউদ (আঃ), তাঁর ছেলে সুলাইমান (আঃ), যাকারিয়া (আঃ) এবং তাঁর ছেলে ইয়াহিয়া (আঃ)। সর্বশেষে আল্লাহ তায়ালার বিশেষ কুদরতে পিতার ঔরস ছাড়াই জন্ম নেন ঈসা (আঃ)। তাঁর মাতা মারইয়াম (আঃ)-ও ছিলেন বনী ইসরাইল বংশের এক পুণ্যবতী নারী।
ইসমাইল (আঃ)-এর বংশধারা এবং ইহুদিদের বিদ্বেষের মূল কারণ
ইব্রাহিম (আঃ)-এর আরেক ছেলে ছিলেন ইসমাইল (আঃ), যাঁকে তিনি আল্লাহর নির্দেশে কুরবানি করতে উদ্যত হয়েছিলেন। এই ইসমাইল (আঃ)-এর বংশধররাই হলেন আরবের অধিবাসী। দীর্ঘকাল পর এই বংশেই আগমন করেন মানবজাতির শেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ)।
বংশগত দিক থেকে আরব এবং ইহুদিরা হলো পরস্পর চাচাতো ভাই। কিন্তু ইহুদিদের মনে আরবদের প্রতি এক তীব্র ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ঈর্ষা কাজ করত। ইহুদিরা তাদের কিতাব পড়ে খুব ভালোভাবে জানত যে, একজন শেষ নবী আসবেন। কিন্তু তাদের প্রত্যাশা ছিল, অতীতের মতো এই শেষ নবীও তাদের বনী ইসরাইল বংশেই জন্ম নেবেন। যখন তারা দেখল যে শেষ নবী ইসমাইল (আঃ)-এর বংশে (আরবে) আগমন করেছেন, তখন স্রেফ বংশীয় অহংকার ও ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে তারা নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-কে অস্বীকার করে। দুনিয়াবী সম্পদের ভাগাভাগি নিয়ে যেমন ভাইয়ে-ভাইয়ে শত্রুতা হয়, ইহুদিদের এই শত্রুতাটি ছিল নবুওয়াতের মর্যাদা নিয়ে।
বনী ইসরাইলের প্রতি আল্লাহর নিয়ামত ও অঙ্গীকার
বনী ইসরাইল ছিল সেকালের সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাহ। তাই আল্লাহ তাদেরকে বিশেষভাবে সম্বোধন করে পূর্বের নিয়ামতগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। নিয়ামত স্মরণ করলে মানুষের মনে কৃতজ্ঞতাবোধ জন্মায়।
তাদের ওপর আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামত ছিল। যেমন:
-
তাদের বংশে অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ।
-
জালিম ফেরাউনের কবল থেকে তাদেরকে অলৌকিকভাবে মুক্তি দান।
-
আসমানি খাবার ‘মান্না ও সালওয়া’ প্রদান।
-
বারবার অবাধ্য হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে ক্ষমা করে পবিত্র ভূমি জয়ের সুযোগ দেওয়া।
অঙ্গীকারটি কী ছিল?
সূরা আল-মায়েদায় আল্লাহ বনী ইসরাইলের সাথে কৃত অঙ্গীকারের বিবরণ দিয়েছেন। আল্লাহ তাদের ১২ গোত্রের ১২ জন প্রতিনিধি নিযুক্ত করে তাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন:
১. তারা সালাত কায়েম করবে এবং জাকাত দেবে।
২. আল্লাহর প্রেরিত সকল রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করবে।
৩. আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করবে।
এর মধ্যে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক শর্তটি ছিল— ভবিষ্যতে আগত নবীদের প্রতি ঈমান আনা ও তাঁদের সাহায্য করা। অর্থাৎ, তাওরাত ও ইঞ্জিলে শেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর যে সুস্পষ্ট বিবরণ দেওয়া ছিল, সেই অনুযায়ী তাঁর প্রতি ঈমান আনা ইহুদি পণ্ডিতদের জন্য অপরিহার্য ছিল। আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তারা যদি এই অঙ্গীকার পূরণ করে তবে তিনি তাদের গুনাহ মাফ করে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। কিন্তু তারা এই অঙ্গীকার ভঙ্গ করে মুসলমানদের সাথে শত্রুতায় লিপ্ত হয়।
আল-কোরআনের অলৌকিকত্ব
সূরা বাকারায় যখন আল্লাহ ইহুদি পণ্ডিতদেরকে তাদের অতীত ইতিহাস ও গোপন অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন তা ছিল কোরআনের সত্যতার এক বিশাল প্রমাণ।
মক্কার বুকে বেড়ে ওঠা একজন নিরক্ষর আরব নবী, যাঁর কাছে পূর্ববর্তী কিতাবের কোনো জ্ঞান বা ভাষা জানা ছিল না; সেই যুগে কোনো ইন্টারনেট বা সার্চ ইঞ্জিনও ছিল না— তিনি কীভাবে নিখুঁতভাবে বনী ইসরাইলের শত শত বছর আগের ইতিহাস, গোপন অঙ্গীকার এবং তাওরাতের বিবরণ মানুষের সামনে তুলে ধরছিলেন? ইহুদি পণ্ডিতদের মনে এই বিষয়ে কোনো সন্দেহেরই অবকাশ ছিল না যে, এগুলো কোনো মানুষের বানানো কথা নয়, বরং তা সরাসরি সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। এরপরও কেবল অহংকারের কারণে তারা সত্য গ্রহণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
(বি.দ্র: এই লেখাটি মূল লেকচারের সারমর্ম ও বক্তব্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে একটি প্রাতিষ্ঠানিক টেক্সটবুক বা প্রবন্ধের উপযোগী করে সম্পাদনা করা হয়েছে।)