সূরা আল-বাকারা ২ঃ৪৮ — যেদিন কেউ কারো কাজে আসবে না
পূর্ববর্তী আয়াতে (২ঃ৪৭) তাদের শ্রেষ্ঠত্বের নিয়ামত স্মরণ করিয়ে এবার আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বনু ইসরাইলকে এক ভয়াবহ দিনের সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। এই সতর্কতার লক্ষ্য একটাই — তারা যেন নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আল কোরআনকে প্রত্যাখ্যান না করে, বরং ইসলামে প্রবেশ করে। আয়াতটি কিয়ামতের দিনের এমন এক চিত্র আঁকে যেখানে অবিশ্বাসীর শেষ আশ্রয়গুলো একে একে কেটে দেওয়া হয়: অন্যের সাহায্য, সুপারিশ, মুক্তিপণ — কিছুই কাজে আসবে না।
وَاتَّقُوا يَوْمًا لَّا تَجْزِي نَفْسٌ عَن نَّفْسٍ شَيْئًا وَلَا يُقْبَلُ مِنْهَا شَفَاعَةٌ وَلَا يُؤْخَذُ مِنْهَا عَدْلٌ وَلَا هُمْ يُنصَرُونَ
Wa-ttaqū yawman lā tajzī nafsun ʿan nafsin shayʾan wa lā yuqbalu minhā shafāʿatun wa lā yuʾkhadhu minhā ʿadlun wa lā hum yunsarūn
“আর তোমরা সেই দিনকে ভয় করো, যেদিন কেউ কারো কোনো কাজে আসবে না, কারো পক্ষ থেকে কোনো সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না, কারো কাছ থেকে কোনো মুক্তিপণ নেওয়া হবে না, এবং তাদের সাহায্যও করা হবে না।”
“সেই দিনকে ভয় করো”: প্রসঙ্গ
“ইত্তাকু” শব্দের মূল অর্থ আত্মরক্ষা করা; প্রসঙ্গভেদে এর অনুবাদ হয় “ভয় করো” অথবা “নিজেদের বাঁচাও।” এখানে “ইয়াওম” তথা দিবসের কথা বলা হয়েছে — অর্থাৎ সেই দিনকে ভয় করো, সেই দিনের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করো।
এই সতর্কতা কোন প্রসঙ্গে, তা প্রসঙ্গ থেকেই বুঝতে হবে। আল্লাহ বনু ইসরাইলকে সাবধান করছেন যেন তারা শেষ নবীর প্রতি ঈমান প্রত্যাখ্যান না করে। মর্মার্থ হলো: অতীতের সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত হওয়া সত্ত্বেও যদি তারা এখন নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান না আনে এবং সেই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তবে তাদের মৃত্যু হবে কুফরের উপর — আর সেই দিনের বর্ণনাই এখানে দেওয়া হচ্ছে।
কেউ কারো কাজে আসবে না
আয়াতের প্রথম অংশ — “কেউ কারো কোনো কাজে আসবে না।” এটি সবার জন্য নিরঙ্কুশভাবে প্রযোজ্য নয়; মুসলিমদের ক্ষেত্রে কিয়ামতের দিন একজন আরেকজনের উপকারে আসতে পারে, তবে তা একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় — ইচ্ছামতো নয়। এখানে বিশেষভাবে অবিশ্বাসীদের কথা বলা হচ্ছে। যে কুফরের উপর মৃত্যুবরণ করে, সেই দিন কোনো কাফির কারো কাজে আসবে না, কোনো মুসলিমও তার কাজে আসবে না।
সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না
এরপর বলা হচ্ছে, কারো পক্ষ থেকে কোনো সুপারিশ (শাফাআত) গ্রহণ করা হবে না। এখানে “মিনহা” সর্বনামটি নাফস তথা ব্যক্তিকে বোঝাচ্ছে — অর্থাৎ কারো থেকেই সুপারিশ কবুল করা হবে না। এই নেতিবাচক বক্তব্যকেও কোরআনের অন্য আয়াত ও হাদিসের আলোকে বুঝতে হবে। এখানে যে সুপারিশ অস্বীকার করা হচ্ছে তা অবিশ্বাসীর জন্য সুপারিশ — কোনো কাফিরের জন্য কোনো সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হবে না, আর কোনো কাফির নিজেও সুপারিশ করতে পারবে না।
কিন্তু অন্যান্য আয়াত ও হাদিস থেকে জানা যায়, আল্লাহর অনুমতিক্রমে সুপারিশ হবে — মুমিনদের মধ্যে পাপাচারীদের জন্য সুপারিশ গ্রহণ করা হবে, এবং মুমিনরা সুপারিশ করতেও পারবে। হাদিসে স্পষ্ট এসেছে, পাপের কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করা মুমিনদের একসময় সুপারিশের মাধ্যমে বের করে আনা হবে। কাফিরদের ক্ষেত্রে এর একমাত্র ব্যতিক্রম আবু তালিব — নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কারণে জাহান্নামে তার শাস্তি লাঘব করা হবে; এ ছাড়া আর কোনো কাফিরের জন্য কোনো সুপারিশ নেই। কোরআন ও হাদিসকে একত্রে না মেলানোর কারণেই বিভিন্ন দল এই প্রশ্নে পথভ্রষ্ট হয়েছে — আমাদের সেই ভুলে পড়া উচিত নয়।
মুক্তিপণ বা সাহায্য — কোনো পথ নেই
এরপর বলা হচ্ছে, কারো কাছ থেকে কোনো “আদল” নেওয়া হবে না। আদল অর্থ মুক্তিপণ — টাকা-পয়সা, জামিন বা জরিমানা দিয়ে শাস্তি থেকে রেহাই। সেই দিন কোনো কাফিরের জন্য মুক্তিপণ দিয়ে শাস্তি থেকে বাঁচার কোনো সুযোগ থাকবে না।
সবশেষে — “ওয়ালা হুম ইউনসারুন,” তারা কোনো সাহায্যও পাবে না। এখানে “হুম” (তারা) শব্দটি যুক্ত করে বিষয়টিতে আরও জোর দেওয়া হয়েছে: সেই দিন তাদের সাহায্য করার কেউ থাকবে না।
শিক্ষা
এই আয়াত অবিশ্বাসীর প্রতিটি মিথ্যা ভরসাকে একে একে খণ্ডন করে: সেই দিন কেউ কারো কাজে আসবে না, কোনো সুপারিশ, মুক্তিপণ বা বাহ্যিক সাহায্য কাফিরকে বাঁচাতে পারবে না। বনু ইসরাইলকে দেওয়া এই সতর্কতার মূল বার্তা চিরন্তন — অতীতের যত বড় মর্যাদাই থাকুক, শেষ নবীকে প্রত্যাখ্যান করে কুফরের উপর মৃত্যু সব আশ্রয়কে অর্থহীন করে দেয়। পাশাপাশি আয়াতটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত শিক্ষাও দেয়: সুপারিশের মতো বিষয়ে কোরআনের একটি আয়াতকে বিচ্ছিন্নভাবে না নিয়ে সমগ্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে বুঝতে হবে — তবেই মুমিন পাপীদের জন্য সুপারিশের আশা এবং কাফিরের জন্য তার অনুপস্থিতি, উভয় সত্য একসাথে স্পষ্ট হয়।