সূরা আল-বাকারা ২ঃ৪৯ — ফেরাউনের দলবলের কবল থেকে উদ্ধার

পূর্ববর্তী আয়াতে কিয়ামতের সতর্কতা দেওয়ার পর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এবার একটি একটি করে সেই নিয়ামতগুলোর বর্ণনা শুরু করছেন যেগুলো তিনি বনু ইসরাইলকে স্মরণ করতে বলেছিলেন। প্রথম ও অন্যতম বড় নিয়ামত — ফেরাউনের দলবলের ভয়াবহ কবল থেকে তাদের উদ্ধার। এই নির্যাতন ও উদ্ধারের ঘটনাপ্রবাহ আগে পটভূমিতে এসেছে; এখানে কোরআন সেই নিয়ামতটিই সরাসরি স্মরণ করাচ্ছে।

وَإِذْ نَجَّيْنَاكُم مِّنْ آلِ فِرْعَوْنَ يَسُومُونَكُمْ سُوءَ الْعَذَابِ يُذَبِّحُونَ أَبْنَاءَكُمْ وَيَسْتَحْيُونَ نِسَاءَكُمْ ۚ وَفِي ذَٰلِكُم بَلَاءٌ مِّن رَّبِّكُمْ عَظِيمٌ

Wa idh najjaynākum min āli Firʿawna yasūmūnakum sūʾa-l-ʿadhābi yudhabbihūna abnāʾakum wa yastahyūna nisāʾakum, wa fī dhālikum balāʾun min rabbikum ʿazīm

“আর (স্মরণ করো) যখন আমি তোমাদের ফেরাউনের দলবলের হাত থেকে রক্ষা করলাম, যারা তোমাদের নিকৃষ্ট শাস্তি আস্বাদন করাচ্ছিল — তোমাদের পুত্রদের জবাই করছিল আর তোমাদের নারীদের বাঁচিয়ে রাখছিল; আর এতে ছিল তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এক বিরাট পরীক্ষা।”

ফেরাউনের দলবলের কবল থেকে উদ্ধার

আয়াতের শুরুতে “ওয়া ইজ” — অর্থাৎ “আর (স্মরণ করো) যখন” — উহ্য “স্মরণ করো” ক্রিয়ার সাথে যুক্ত হয়ে সেই সময়টিকে স্মরণ করতে বলা হচ্ছে। “নাজ্জাইনা” — আমি রক্ষা করলাম। এখানে বহুবচনের সর্বনাম ব্যবহৃত হলেও তা প্রকৃত বহুবচন নয়, বরং কর্তৃত্ব ও মহিমা প্রকাশের ভঙ্গি (রয়্যাল উই) — যা আরবি ও ইংরেজিতে থাকলেও বাংলায় নেই; তাই অনুবাদে বিভ্রান্তি এড়াতে “আমি” বলাই শ্রেয়।

“ফেরাউনের আল” বলতে এখানে কেবল ফেরাউনের পরিবার নয়, বরং তার ধর্মের অনুসারী, তার দলবল, সৈন্য-সামন্ত — সবাইকে বোঝানো হয়েছে (“আল” শব্দটি কখনো পরিবার, কখনো অনুসারী অর্থে আসে; এখানে অনুসারী অর্থে)। এই দলবল বনু ইসরাইলকে “সূউল আজাব” তথা নিকৃষ্ট শাস্তি আস্বাদন করাচ্ছিল — তাদের উপর ভয়াবহ নির্যাতন চালাচ্ছিল। সেই নির্যাতনের রূপ ছিল দুটি: তারা পুত্রসন্তানদের জবাই করছিল এবং নারীদের বাঁচিয়ে রাখছিল (যেন তারা দাসত্ব ও শ্রমে টিকে থাকে)। এমন এক ভয়ঙ্কর অবস্থা থেকে আল্লাহর উদ্ধারই ছিল তাদের প্রতি বিরাট এক অনুগ্রহ।

“বিরাট পরীক্ষা”: বালা শব্দের দুই অর্থ

আয়াতের শেষে বলা হচ্ছে, “এতে ছিল তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এক বিরাট পরীক্ষা (বালা)।” লক্ষণীয়, এখানে “বালা” শব্দের অর্থ নিয়ে মুফাসসিরগণ পরস্পর-বিপরীত দুটি ব্যাখ্যা করেছেন।

এক মতে, এখানে “বালা” অর্থ কঠিন পরীক্ষা ও বিপদ — অর্থাৎ ফেরাউনের দলবল যে ভয়াবহ নির্যাতন চালিয়েছিল, তা-ই ছিল তাদের জন্য এক বড় পরীক্ষা। অন্য মতে — এবং এটিই সালাফদের অধিকাংশের অভিমত — এখানে “বালা” অর্থ নিয়ামত; অর্থাৎ ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়ে আল্লাহ তাদের উপর যে বিরাট অনুগ্রহ করেছেন, সেটিই এই “পরীক্ষা।”

দুটি অর্থই সম্ভব, কারণ “বালা” শব্দের মূল অর্থ পরীক্ষা — আর আল্লাহ মানুষকে দুইভাবে পরীক্ষা করেন: নিয়ামত দিয়ে (সে কৃতজ্ঞ হয় কিনা) এবং বিপদ দিয়ে (সে ধৈর্য ধরে কিনা)। এ কথাই আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেছেন —

وَنَبْلُوكُم بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ فِتْنَةً

Wa nablūkum bi-sh-sharri wa-l-khayri fitnah

“আর আমি তোমাদের মন্দ ও ভালো উভয় দিয়ে পরীক্ষা করি।”

সুতরাং এই আয়াতে “পরীক্ষা” বলতে নিয়ামতের পরীক্ষা (নিয়ামত পেয়ে শুকরিয়া) কিংবা বিপদের পরীক্ষা (বিপদে ধৈর্য) — উভয়ই উদ্দিষ্ট হতে পারে।

শিক্ষা

ফেরাউনের দলবলের হাতে পুত্রহত্যার মতো নিকৃষ্ট নির্যাতন থেকে উদ্ধার ছিল বনু ইসরাইলের প্রতি আল্লাহর অন্যতম বড় নিয়ামত — যা তাদের বারবার স্মরণ করানো হচ্ছে। আর “বালা” শব্দের দ্বৈত অর্থ আমাদের জীবনের গভীর এক সত্য মনে করিয়ে দেয়: নিয়ামত ও বিপদ — দুটোই আসলে পরীক্ষা। নিয়ামতে কৃতজ্ঞতা আর বিপদে ধৈর্য — এই দুই পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ হওয়াই বান্দার প্রকৃত কাজ।