সূরা আল-বাকারা ২ঃ৫৬ — মৃত্যুর পর পুনর্জীবন

আগের আয়াতে (২ঃ৫৫) দেখা গেল, আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখার ঔদ্ধত্যপূর্ণ দাবির পরিণামে এক ভয়ঙ্কর শাস্তি বনু ইসরাইলকে পাকড়াও করে মৃত্যু ঘটায়। এই আয়াতে ফুটে ওঠে আল্লাহর রহমত — সেই মৃত্যুর পরও তিনি তাদের পুনর্জীবন দান করলেন, যেন তারা কৃতজ্ঞ হয়। এরপর একটি প্রশ্ন ওঠে: গোটা ঘটনাটি কালানুক্রমে ঠিক কোথায় বসে? এ নিয়ে দুটি বর্ণনা রয়েছে।

ثُمَّ بَعَثْنَاكُم مِّن بَعْدِ مَوْتِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

Thumma baʿathnākum min baʿdi mawtikum laʿallakum tashkurūn

“অতঃপর তোমাদের মৃত্যুর পর আমি তোমাদের পুনর্জীবিত করলাম, যেন তোমরা কৃতজ্ঞ হও।”

মৃত্যুর পর পুনর্জীবন

“সুম্মা বাআসনাকুম” — অতঃপর আমি তোমাদের পুনর্জীবিত করলাম। “বাআসা” শব্দের অর্থ উত্থান ঘটানো; এখানে তা পুনর্জীবন দান অর্থে এসেছে। “মিন বাদি মাওতিকুম” — তোমাদের মৃত্যুর পর, অর্থাৎ সেই শাস্তিতে মৃত্যুর পর। “লাআল্লাকুম তাশকুরুন” — যেন তোমরা কৃতজ্ঞ হও।

লক্ষণীয়, এই ঘটনায় যারা মারা গিয়ে পুনর্জীবন পেল, কোনো কোনো বর্ণনায় তারা ছিল বনু ইসরাইলের শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধিরা। শ্রেষ্ঠ লোকদেরও যখন এমন পদস্খলন ঘটে, তখন বোঝা যায় আল্লাহ তাদের প্রতি কত দয়া করেছেন — এত বড় অপরাধের পরও মৃত্যুর পর আবার জীবন দিয়ে তওবার সুযোগ দিলেন।

ঘটনাটি কখন ঘটেছিল: দুই বর্ণনা

এই “আল্লাহকে দেখতে চাওয়া → মৃত্যু → পুনর্জীবন” ঘটনাটি স্বর্ণের বাছুরের ঘটনা ও পরস্পরকে হত্যার তওবার সাথে কোন ক্রমে ঘটেছিল, তা নিয়ে দুটি বর্ণনা রয়েছে।

প্রথম বর্ণনা অনুযায়ী, বাছুরপূজার পর মুসা আলাইহিস সালাম এসে স্বর্ণের মূর্তিটি ধ্বংস করলেন, এবং গোটা জাতির পক্ষ থেকে তওবার জন্য এক বিশেষ অধিবেশনে সত্তরজন প্রতিনিধিকে তাঁর সাথে নিয়ে গেলেন। সেই অধিবেশনে যখন আল্লাহ ও মুসা আলাইহিস সালামের কথোপকথন শুরু হলো, তাঁরা আল্লাহর বাণী শুনতে চাইলেন এবং সিজদায় লুটিয়ে পড়ে তা শুনলেন। কিন্তু কথোপকথন শেষে তাঁরা দাবি করলেন — শুধু শুনলে হবে না, আল্লাহকে স্বচক্ষে না দেখা পর্যন্ত বিশ্বাস করব না। ফলে (সূরা আরাফের বর্ণনামতো) এক ভূমিকম্প-প্রকম্পন তাঁদের আঘাত করল ও তাঁরা মারা গেলেন; মুসা আলাইহিস সালামের কাকুতিতে আল্লাহ তাঁদের পুনর্জীবিত করলেন। এরপর বাছুরপূজার ক্ষমার জন্য আল্লাহ শর্ত দিলেন — পরস্পরকে হত্যা না করা পর্যন্ত তওবা কবুল হবে না। অর্থাৎ এই বর্ণনামতে “দেখতে চাওয়া → মৃত্যু → পুনর্জীবন” ঘটনাটি পরস্পরকে হত্যার তওবার আগে।

দ্বিতীয় বর্ণনা — আর এই বর্ণনার ভিত্তিতেই আমাদের ছয়-ঘটনার রোডম্যাপ সাজানো — অনুযায়ী ঘটনাটি ঘটেছিল পরস্পরকে হত্যার মাধ্যমে ক্ষমা লাভের পর। এই মতে, মুসা আলাইহিস সালাম মূর্তি ধ্বংস করে তাদের পরস্পরকে হত্যার মাধ্যমে তওবা করতে বললেন, তারা তওবা করল। এরপর যখন তাদের তাওরাত আঁকড়ে ধরার আদেশ দেওয়া হলো, তারা মানতে চাইল না এবং দাবি করল — আল্লাহ নিজে দেখা দিয়ে সরাসরি তাদের সাথে কথা বলবেন। ফলে বজ্রাঘাতে তাদের মৃত্যু ঘটে, আল্লাহ আবার তাদের জীবিত করেন ও তাওরাত গ্রহণের নির্দেশ দেন; তবু তারা অস্বীকার করলে ফেরেশতারা তুর পাহাড়কে তুলে এনে তাদের মাথার উপর ধরেন, আর সেই চাপা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাদের তাওরাতের অঙ্গীকারে বাধ্য করা হয়।

শিক্ষা

আয়াতটির মূল বার্তা আল্লাহর অপার রহমত: এমন ঔদ্ধত্যের শাস্তিতে মৃত্যুর পরও তিনি পুনর্জীবন দিয়ে আরেকবার সুযোগ দিলেন — আর তার উদ্দেশ্য কৃতজ্ঞতা। ঘটনাটির কালানুক্রম নিয়ে দুই বর্ণনার কোনটি সঠিক তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ জরুরি নয়; উভয় বর্ণনাতেই মূল শিক্ষা অভিন্ন — বনু ইসরাইলের বারবার অবাধ্যতা, এবং তা সত্ত্বেও আল্লাহর বারবার ক্ষমা ও অনুগ্রহ। শ্রেষ্ঠ মানুষও যেখানে পদস্খলিত হতে পারে, সেখানে প্রতিটি নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা ও ঈমানে অবিচল থাকাই আমাদের কর্তব্য।