সূরা আল-বাকারা ২ঃ৫৮ — নতশিরে প্রবেশ ও “হিত্তা”

রোডম্যাপের কালানুক্রমে এটিই শেষ ঘটনা — চল্লিশ বছরের যাযাবর জীবনের পর যখন অবশেষে তারা বায়তুল মাকদিসে প্রবেশ করল। ততদিনে মুসা আলাইহিস সালাম আর নেই, তিনি ইন্তিকাল করেছেন; ইউশা আলাইহিস সালামের নেতৃত্বে বনু ইসরাইল বায়তুল মাকদিস বিজয় করে। এই বিজয়ের পর তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল — বিনয়ের সাথে, নতশিরে প্রবেশ করো, অবারিত রিজিক ভোগ করো, আর ক্ষমা প্রার্থনা করো “হিত্তা” বলে; বিনিময়ে গুনাহ মাফ ও সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি। (তবে তাদের একদল — সবাই নয় — এই আদেশকে বিদ্রূপে পরিণত করেছিল, যা পরের আয়াতে আসবে।)

وَإِذْ قُلْنَا ادْخُلُوا هَٰذِهِ الْقَرْيَةَ فَكُلُوا مِنْهَا حَيْثُ شِئْتُمْ رَغَدًا وَادْخُلُوا الْبَابَ سُجَّدًا وَقُولُوا حِطَّةٌ نَّغْفِرْ لَكُمْ خَطَايَاكُمْ ۚ وَسَنَزِيدُ الْمُحْسِنِينَ

Wa idh qulnā-dkhulū hādhihi-l-qaryata fa-kulū minhā haythu shiʾtum raghadan wa-dkhulū-l-bāba sujjadan wa qūlū hittatun naghfir lakum khatāyākum, wa sanazīdu-l-muhsinīn

“আর (স্মরণ করো) যখন আমি বললাম, তোমরা এই জনপদে প্রবেশ করো, আর সেখান থেকে যেখানে খুশি স্বাচ্ছন্দ্যে খাও; আর দরজা দিয়ে মাথা নিচু করে (বিনয়ের সাথে) প্রবেশ করো এবং বলো ‘হিত্তা’ (আমাদের গুনাহ মাফ করুন) — তাহলে আমি তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দেব, আর সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বাড়িয়ে দেব।”

জনপদে প্রবেশ ও অবারিত রিজিক

“উদখুলু হাদিহিল কারিয়া” — তোমরা এই জনপদে প্রবেশ করো। “কারিয়া” অর্থ শহর, গ্রাম বা যেকোনো জনপদ; এখানে উদ্দেশ্য বায়তুল মাকদিস তথা ফিলিস্তিন অঞ্চল — সেই বরকতময় ভূমি, যেখানে বহু নবী-রাসূলের পদচারণা ছিল। এরপর “ফা-কুলু মিনহা হাইসু শিতুম রাগাদান” — আর প্রবেশ করে সেই সমৃদ্ধ জনপদ থেকে যেখানে খুশি স্বাচ্ছন্দ্যে খাও। “হাইসু শিতুম” অর্থ যেখানে ইচ্ছা, আর “রাগাদান” অর্থ প্রচুর পরিমাণে, বিনা কষ্টে, আরাম করে — কত খেলে তার কোনো হিসাব নেই। (উল্লেখ্য, “রাগাদান” শব্দটি এর আগে আদম আলাইহিস সালামকে জান্নাতে খাওয়ার অনুমতি প্রসঙ্গেও এসেছিল।)

নতশিরে প্রবেশ ও “হিত্তা”

“ওয়াদখুলুল বাবা সুজ্জাদান” — আর দরজা দিয়ে সিজদার অবস্থায় প্রবেশ করো। এখানে “সুজ্জাদান” অর্থ মাটিতে কপাল ঠেকানো সিজদা নয় — কারণ কপাল মাটিতে ঠেকিয়ে দরজা দিয়ে হেঁটে প্রবেশ করা সম্ভব নয়; বরং যেকোনো ঝুঁকে পড়াকেও সিজদা বলা যায়। তাই আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, এর অর্থ মাথা নিচু করে, বিনয় ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও ইবাদতের অনুভূতি নিয়ে প্রবেশ করা।

এরপর “ওয়া কুলু হিত্তা” — আর বলো “হিত্তা।” “হিত্তা”র মূল অর্থ (বোঝা) নামিয়ে দেওয়া, অর্থাৎ গুনাহ মাফ করা; সাবলীল অনুবাদে “আমাদের ক্ষমা চাই।” ব্যাকরণগতভাবে এর ভাব — “আপনার কাছে আমাদের চাওয়া হলো ক্ষমা।” তারা যদি এই বিনয়ের শব্দটুকু বলত, তবে কত বড় উপকারই না হতো।

ক্ষমার প্রতিশ্রুতি ও মুহসিনদের বৃদ্ধি

এই বিনয়ের বিনিময়ে প্রতিশ্রুতি — “নাগফির লাকুম খাতায়াকুম,” আমি তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করে দেব (“খাতিয়া” অর্থ পাপ, এর বহুবচন “খাতায়া”)। আর “ওয়া সানাজিদুল মুহসিনিন” — আর সৎকর্মশীলদের আমি বাড়িয়ে দেব। “নাজিদু” অর্থ আমরা বৃদ্ধি করি; এর সাথে “সা” যুক্ত হয়ে “সানাজিদু” হলে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়ে যায় — অর্থাৎ অচিরেই অবশ্যই বাড়িয়ে দেব। মুফাসসিরগণ বলেছেন, বাড়িয়ে দেওয়া হবে তাদের সওয়াব, আর আল্লাহ তাদের প্রতি নিজের অনুগ্রহও বাড়িয়ে দেবেন।

এখানে “মুহসিন” হলো সেই ব্যক্তি যে ইহসান করে। ইহসানের দুটি দিক — এক, আল্লাহর ইবাদত উত্তম পন্থায়, সুন্নাহ অনুযায়ী সুন্দরভাবে আদায় করা; আর দুই, আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি উপকার করা। এই দুই মিলেই ইহসান, আর যে তা করে সে-ই মুহসিন — সহজ বাংলায় সৎকর্মশীল।

শিক্ষা

বায়তুল মাকদিস বিজয়ের পর আল্লাহ বনু ইসরাইলকে যা দিয়েছিলেন তা অবারিত অনুগ্রহ — বরকতময় ভূমি, স্বাচ্ছন্দ্যের রিজিক, আর সামান্য বিনয়ের বিনিময়ে সমস্ত পাপ মোচনের প্রতিশ্রুতি। আল্লাহ চেয়েছিলেন তারা কৃতজ্ঞতা ও নম্রতায় মাথা নিচু করে প্রবেশ করুক এবং ক্ষমা চাক — বিজয়ের মুহূর্তে অহংকার নয়, বিনয়ই কাম্য। আর যারা উত্তমভাবে ইবাদত করে ও সৃষ্টির উপকার করে, সেই মুহসিনদের জন্য আল্লাহর প্রতিশ্রুতি আরও বেশি — তিনি অচিরেই তাদের প্রতিদান ও অনুগ্রহ বাড়িয়ে দেন।