সূরা আল-বাকারা ২ঃ৬০ — পাথর থেকে বারো ঝর্ণা
চল্লিশ বছরের যাযাবর জীবনের নিয়ামতগুলোর মধ্যে এই আয়াতে আসছে পানির অলৌকিক ব্যবস্থা — মুসা আলাইহিস সালাম পানি চাইলেন, পাথরে আঘাত করলেন, আর বারো গোত্রের জন্য বারোটি ঝর্ণা বয়ে গেল। আয়াতের শেষে তাদের নির্দেশ দেওয়া হলো — আল্লাহর রিজিক থেকে খাও-পান করো, কিন্তু পৃথিবীতে বিপর্যয় ছড়িয়ো না। একটি বিষয় শুরুতেই বলা দরকার: এই ঘটনা কালানুক্রমে মান্না-সালওয়ার সাথেই (যাযাবর জীবনে) ঘটেছিল, কিন্তু কুরআন এখানে তা উল্লেখ করছে — কারণ কুরআনের বিন্যাস সবসময় কালানুক্রমিক নয়।
وَإِذِ اسْتَسْقَىٰ مُوسَىٰ لِقَوْمِهِ فَقُلْنَا اضْرِب بِّعَصَاكَ الْحَجَرَ ۖ فَانفَجَرَتْ مِنْهُ اثْنَتَا عَشْرَةَ عَيْنًا ۖ قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍ مَّشْرَبَهُمْ ۖ كُلُوا وَاشْرَبُوا مِن رِّزْقِ اللَّهِ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ
Wa idhi-stasqā Mūsā li-qawmihi fa-qulnā-drib bi-ʿasāka-l-hajara fa-nfajarat minhu-thnatā ʿashrata ʿaynan, qad ʿalima kullu unāsin mashrabahum, kulū wa-shrabū min rizqi-llāhi wa lā taʿthaw fi-l-ardi mufsidīn
“আর (স্মরণ করো) যখন মুসা তার জাতির জন্য পানি চাইল, তখন আমি বললাম — তোমার লাঠি দিয়ে পাথরে আঘাত করো। ফলে তা থেকে বারোটি ঝর্ণা প্রবাহিত হলো; প্রত্যেক গোত্র তাদের পানির স্থান চিনে নিল। ‘আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে খাও ও পান করো, আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়িও না।'”
পাথর থেকে বারো ঝর্ণা
“ওয়া ইজিস তাসকা মুসা লিকাওমিহি” — আর যখন মুসা তার জাতির জন্য পানি চাইল। “ইস্তাসকা” অর্থ পানি প্রার্থনা করা; মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে তাঁর জাতির জন্য পানি চাইলেন। “ফাকুলনাদরিব বিআসাকাল হাজার” — তখন আমি বললাম, তোমার লাঠি দিয়ে পাথরে আঘাত করো। “ফানফাজারাত মিনহুস নাতা আশরাতা আইনান” — ফলে তা থেকে বারোটি ঝর্ণা প্রবাহিত হলো — বনু ইসরাইলের বারোটি গোত্রের জন্য বারোটি ঝর্ণা।
আলাদা আলাদা বারোটি ঝর্ণা কেন? কারণ তারা ছিল বিবাদপ্রবণ; একটি অভিন্ন উৎস থাকলে কোন গোত্র কোথা থেকে পানি নেবে, এই পানি কার — এসব নিয়ে বিবাদ বেধে যেতে পারত। তাই প্রতিটি গোত্রের জন্য পৃথক ঝর্ণা নির্ধারিত হলো, আর “কাদ আলিমা কুল্লু উনাসিন মাশরাবাহুম” — প্রত্যেক গোত্র তাদের নিজ নিজ পানির স্থান চিনে নিল, যাতে ঝগড়ার অবকাশই না থাকে।
“খাও, পান করো, কিন্তু ফাসাদ করো না”
এরপর বলা হচ্ছে “কুলু ওয়াশরাবু মিন রিজকিল্লাহ” — আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে খাও ও পান করো (খাওয়ার জন্য মান্না-সালওয়া, পান করার জন্য এই ঝর্ণার পানি)। কিন্তু সাথে সাথে সতর্ক করা হলো — “ওয়ালা তাসাও ফিল আরদি মুফসিদিন,” আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী হয়ে সীমালঙ্ঘন করে বেড়িও না। খাদ্য ও পানির এমন অলৌকিক ব্যবস্থা পাওয়ার পরও যেন তারা অবাধ্যতা ও ফাসাদে লিপ্ত না হয় — নিয়ামতের দাবি কৃতজ্ঞতা, বিপর্যয় নয়।
কুরআন সবসময় কালানুক্রমিক নয়
এই আয়াত থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত বিষয় স্পষ্ট হয়। পাথর থেকে পানির এই ঘটনা প্রকৃতপক্ষে ঘটেছিল যাযাবর জীবনে, মান্না-সালওয়ার সময়েই। কিন্তু কুরআনে মান্না-সালওয়ার (২ঃ৫৭) কথা বলার পর বায়তুল মাকদিসে প্রবেশ ও “হিত্তা”র ঘটনায় (২ঃ৫৮–৫৯) চলে গিয়ে, আল্লাহ আবার ফিরে এসে এখানে পানির ঘটনাটি বলছেন। অর্থাৎ কুরআনে সবকিছু কালানুক্রমে সাজানো থাকে না — এটি মনে রাখা জরুরি, নইলে ঘটনার ক্রম মেলাতে গিয়ে বিভ্রান্তি হতে পারে।
শিক্ষা
পাথর থেকে বারোটি ঝর্ণা প্রবাহিত করা আল্লাহর কুদরত ও অনুগ্রহের এক উজ্জ্বল নিদর্শন — এমনকি শাস্তির যাযাবর জীবনেও তিনি তাদের খাদ্য ও পানির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। প্রতিটি গোত্রের জন্য পৃথক ঝর্ণার ব্যবস্থা দেখায়, আল্লাহ কীভাবে তাদের বিবাদের আশঙ্কা পর্যন্ত দূর করে দিয়েছেন। অথচ এত অনুগ্রহের পরও সতর্কবাণী থেকে গেল — খাও-পান করো, কিন্তু ফাসাদ করো না; কারণ নিয়ামত পেয়ে কৃতজ্ঞ না হয়ে সীমালঙ্ঘনে নামাই প্রকৃত অকৃতজ্ঞতা। আর কুরআন যে সবসময় কালানুক্রমিক নয়, এই উপলব্ধিও তাফসীর বোঝার একটি জরুরি চাবিকাঠি।