সূরা আল-বাকারা: বনু ইসরাইলের ছয়টি বড় ঘটনা — একটি রোডম্যাপ

সামনের আয়াতগুলোতে প্রবেশের আগে বনু ইসরাইলের ঘটনাপ্রবাহকে ছয়টি বড় ঘটনায় ভাগ করে, মোটামুটি কালানুক্রমে সাজিয়ে নেওয়া যাক। এই ঘটনাগুলো ও এদের সাথে সংশ্লিষ্ট আলোচনা কুরআনের নানা জায়গায় বারবার আসবে — সূরা বাকারা, মায়িদা, আরাফ, ত্বহা, কাসাসসহ আরও অনেক সূরায়। এই ছয়টি ঘটনা মাথায় থাকলে বিক্ষিপ্ত এই বিবরণগুলো পরস্পরের সাথে মিলিয়ে নিতে সহজ হবে। উল্লেখ্য, ক্রমটি ইসরাইলিয়াতের সাহায্যে সাজানো, তাই তা শতভাগ নির্ভুল হবে এমন নয়; আর ইসরাইলিয়াতের আলোকে আয়াতের তাফসীর করা সালাফদেরই পদ্ধতি — ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু ও মুজাহিদসহ বহু মুফাসসিরের বর্ণনায় তা ভরপুর।

ফেরাউনের কবল থেকে উদ্ধার ও সাগর বিদারণ

প্রথম বড় ঘটনা — ফেরাউনের কবল থেকে উদ্ধার। মুসা আলাইহিস সালাম বনু ইসরাইলকে নিয়ে মিশর থেকে বেরিয়ে এলেন; আল্লাহর নির্দেশে তাঁরা সমুদ্রের দিকে যাত্রা করলেন, আর মুসা আলাইহিস সালাম লাঠি দিয়ে আঘাত করতেই বারো গোত্রের জন্য বারোটি শুকনো পথ তৈরি হয়ে গেল, যা দিয়ে তাঁরা পার হয়ে গেলেন। ফেরাউন ও তার দলবল যখন পিছু নিল, তারা ডুবে গেল। এত বড় অলৌকিক নিদর্শন দেখেও ফেরাউনের সেই পথে নেমে পড়া এক ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত — অহংকার ও উদ্ধত্য কীভাবে মানুষকে অন্ধ করে দেয়। আল্লাহ যখন কারো ধ্বংস নির্ধারণ করেন, তখন এভাবেই তাকে অন্ধ করে দেন।

তুর পাহাড়ে তাওরাত ও স্বর্ণের বাছুর

দ্বিতীয় ঘটনা — মুসা আলাইহিস সালাম তুর পাহাড়ে চল্লিশ দিনের অধিবেশনে গেলেন, যেখানে তাঁকে তাওরাত তথা শরীয়ত দান করা হবে। ফেরাউনের কবল থেকে উদ্ধারের মতোই বড় নিয়ামত এই তাওরাত-প্রাপ্তি — কারণ গাইডেন্স ছাড়া মানুষের জীবন সবচেয়ে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। অথচ ঠিক এই সময়েই বনু ইসরাইল স্বর্ণের বাছুরের পূজায় লিপ্ত হলো; সামিরীর ভূমিকা ও সম্ভবত অন্য জাতির মূর্তিপূজা দেখে সৃষ্ট আকর্ষণ এর পেছনে কাজ করেছিল।

এখানে একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবার মতো: বনু ইসরাইল কিন্তু ছিল এক ধার্মিক সম্প্রদায় — তাদের মধ্যে বহু নবী-রাসূল এসেছেন। তবু তারা এভাবে পদস্খলিত হলো। তাই তাদের এই বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের নিজেদের ওপর প্রয়োগ করা দরকার। আমরা যারা দ্বীন শিখছি, নিজেদের ধার্মিক মনে করি — এই বাণীগুলো আমাদের জন্য আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানে দেখানো হচ্ছে কীভাবে একটি ধার্মিক সম্প্রদায়ও পদস্খলিত হতে পারে, এমনকি শিরকে পতিত হতে পারে, আর কীভাবে নিয়ামতের নাশুকরি ঘটে।

এত বড় অপরাধের পরও আল্লাহ তাদের তওবার সুযোগ দিলেন — যদিও এক কঠিন প্রক্রিয়ায়: নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তারা পরস্পরকে হত্যা করবে; যারা মারা যাবে তা শাহাদাত, আর যারা বেঁচে থাকবে তাদের জন্য তা তওবা হিসেবে গ্রাহ্য। এত বড় পাপের পরও তওবার সুযোগদান নিজেই আল্লাহর এক বিরাট নিয়ামত।

“আল্লাহকে না দেখা পর্যন্ত ঈমান আনব না”

তৃতীয় ঘটনা — তওবা কবুলের পর তাওরাতকে আঁকড়ে ধরার অঙ্গীকারের পালা। মুসা আলাইহিস সালাম যখন তাদের এই অঙ্গীকারে আহ্বান করলেন, তখন তাদের গভীর অবাধ্যতা আবার মাথাচাড়া দিল। তারা বলে বসল — “আল্লাহকে প্রকাশ্যে না দেখা পর্যন্ত আমরা তোমাকে বিশ্বাস করব না; আল্লাহ আমাদের সামনে এসে কথা বলুন, আমরাও তাঁর কথা শুনতে চাই।” (এটি সামনের আয়াতে আসবে।) সঙ্গে সঙ্গে আকাশ থেকে বজ্র, প্রচণ্ড আওয়াজ কিংবা ভূমিকম্প — বর্ণনাভেদে কোনো এক শাস্তির মাধ্যমে তাদের মৃত্যু দেওয়া হলো। এরপর মুসা আলাইহিস সালামের কাকুতি-মিনতিতে আল্লাহ তাদের পুনরায় জীবন দান করলেন।

তাওরাতের অঙ্গীকার ও মাথার উপর পাহাড়

চতুর্থ ঘটনা — পুনর্জীবনের পরও যখন তাদের তাওরাত মেনে চলার অঙ্গীকার করতে বলা হলো, তারা তা অস্বীকার করল। শেষ পর্যন্ত ফেরেশতারা তুর পাহাড়কে তাদের মাথার উপর তুলে ধরে, চাপা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাদের এই অঙ্গীকারে বাধ্য করলেন। (এই পাহাড় তুলে ধরার বিবরণ সামনের আলোচনায় আসবে; কুরআনে এটি সূরা বাকারা ও আরাফসহ একাধিক স্থানে এসেছে। প্রসঙ্গত, “তুর” একটি নির্দিষ্ট পাহাড়ের নাম, নাকি সাধারণভাবে “পাহাড়” — এ নিয়ে দুটি মত আছে; প্রচলিত তাফসীর অনুযায়ী এখানে তুরকে একটি পাহাড়ের নাম হিসেবেই ধরা হচ্ছে।) এত বড় বড় অলৌকিক নিদর্শন দেখেও কেবল আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার অঙ্গীকারে এমন বারবার অবাধ্যতা তাদের হৃদয়ের কাঠিন্যকেই স্পষ্ট করে।

পবিত্র ভূমিতে প্রবেশে অস্বীকার ও ৪০ বছরের যাযাবর জীবন

পঞ্চম ঘটনা — মিশর থেকে বেরিয়ে সিনাই উপদ্বীপ পেরিয়ে তারা শামের দিকে অগ্রসর হলো। আল্লাহ তাদের জন্য বায়তুল মাকদিস তথা পবিত্র ভূমি নির্ধারণ করেছিলেন — বহু নবী-রাসূলের বাসস্থান এই পুণ্যভূমিতে প্রবেশ করে বসবাস ও আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠার আদেশ দেওয়া হলো। কিন্তু সেখানে তখন শক্তিশালী এক অবিশ্বাসী সম্প্রদায় (আমালিকা) ছিল। আল্লাহ বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও তারা প্রবেশে অস্বীকার করল; দু’জন সৎ ব্যক্তি (যাঁদের নাম কুরআনে আসেনি) তাদের প্রবেশে উৎসাহ দিলেও তারা মুসা আলাইহিস সালামকে বলে বসল — “হে মুসা, তারা যতক্ষণ ওখানে আছে আমরা কিছুতেই প্রবেশ করব না; তুমি আর তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ করো, আমরা এখানেই বসে থাকব।” একজন নবীর প্রতি এমন দৃষ্টতা তাদের অবাধ্যতার গভীরতাই দেখায়।

তাদের এই আচরণ থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়। এক, আল্লাহ কীভাবে বারবার সুযোগ দিয়ে তাদের প্রতি অপার অনুগ্রহ করেছেন। আর দুই, কেন তাদের শরীয়তে অপেক্ষাকৃত কঠোর বিধান ছিল — তাদের বারবার প্রদর্শিত অবাধ্যতা ও হৃদয়ের কাঠিন্যের প্রেক্ষিতেই সেই কঠোরতা, যেখানে ইসলামের শরীয়তকে আল্লাহ সহজ করে দিয়েছেন।

এই অস্বীকারের শাস্তিস্বরূপ বায়তুল মাকদিস তাদের জন্য চল্লিশ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে গেল; তারা মিশর ও শামের মাঝের উন্মুক্ত মরুপ্রান্তরে পথহারা হয়ে যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াতে লাগল। এই চল্লিশ বছরের মধ্যেই মুসা আলাইহিস সালাম মারা যান, আর শেষে আরেক নবী ইউশা আলাইহিস সালামের নেতৃত্বে তারা বায়তুল মাকদিস জয় করে।

তবু এই শাস্তির মধ্যেও আল্লাহর নিয়ামত থেমে থাকেনি। প্রখর রোদে ছায়ার অভাবে কষ্ট পেলে আল্লাহ মেঘ দিয়ে তাদের ছায়া দিলেন; খাদ্যের প্রয়োজনে অলৌকিকভাবে দুটি খাবার পাঠালেন — “মান্না” (মূল শব্দ “মান”), যা শিশিরের মতো পাতায় জমা মধুজাতীয় তরল, আর “সালওয়া” নামক পাখি, যা তারা ধরে খেত; আর পানির জন্য মুসা আলাইহিস সালাম পাথরে আঘাত করলে বারো গোত্রের জন্য বারোটি ঝর্ণাধারা বয়ে যেত। শাস্তির মাঝেও এমন অনুগ্রহ আল্লাহর রহমতেরই প্রকাশ।

দরজায় বিনয়ে প্রবেশ ও “হিত্তা”-র বিদ্রূপ

ষষ্ঠ ঘটনা — তাদের বলা হলো, বিজয়ের পর নগরের দরজা দিয়ে মাথা নিচু করে, বিনয় ও কৃতজ্ঞতার সাথে প্রবেশ করো, আর বলো “হিত্তা” — অর্থাৎ হে আল্লাহ, আমাদের গুনাহের বোঝা লাঘব করে দিন, ক্ষমা করুন। কিন্তু তাদের অভ্যস্ত অবাধ্যতা আবার প্রকাশ পেল: মাথা নিচু করে বিনয়ের সাথে প্রবেশের বদলে তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুতভাবে প্রবেশ করল; আর “হিত্তা” বলার বদলে তারা এক অর্থহীন বিদ্রূপাত্মক কথা বলল (কোনো বর্ণনায় “হাব্বাতুন ফি শাআরাতিন” — যেমন বুখারী-মুসলিমে এসেছে — অর্থাৎ গমের দানা জাতীয় কিছু)। বিনয়ের নির্দেশকে তারা ঠাট্টায় পরিণত করল।

এখানে আমাদের সবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা আছে। দ্বীন বা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ অত্যন্ত মারাত্মক — এমনকি কুফরি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে। আমাদের অনেকের মধ্যেও ঠাট্টা-বিদ্রূপের অভ্যাস ঢুকে গেছে; এই অভ্যাস পরিবর্তন করা জরুরি, কারণ অজান্তেই দ্বীন, কোনো আলেম বা দ্বীনের কোনো দিক নিয়ে বিদ্রূপ করে বসলে তা কুফরির দিকে টেনে নিতে পারে। এ ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকতে হবে।

শিক্ষা

এই ছয়টি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে একটি সুস্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে: অগণিত অলৌকিক নিয়ামত ও নিদর্শন পাওয়ার পরও বনু ইসরাইল বারবার অবাধ্যতা ও নিয়ামতের নাশুকরিতে পতিত হয়েছে, আর প্রতিবার আল্লাহ তাদের নতুন সুযোগ ও নতুন অনুগ্রহ দিয়েছেন। এই ইতিহাস মূলত আমাদের জন্যই আয়না — বিশেষত আমরা যারা নিজেদের ধার্মিক মনে করি, কারণ একটি ধার্মিক সম্প্রদায়ের পদস্খলনই এখানে সতর্কবার্তা হিসেবে সামনে রাখা হয়েছে। এই ছয়টি ঘটনা মাথায় রেখে সামনের আয়াতগুলো বুঝতে আমাদের সহজ হবে, ইনশাআল্লাহ।