মুনাফিকদের উদ্ভব: একটি পটভূমি

সূরা আল-বাকারার সূচনায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানবজাতিকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করে পরিচয় করিয়ে দেন — মুত্তাকী, অবিশ্বাসী এবং মুনাফিক। এই তিন শ্রেণির মধ্যে মুনাফিকদের বিবরণেই সবচেয়ে বেশি আয়াত ব্যয় হয়েছে। কিন্তু সেই আয়াতগুলোর ভেতরে প্রবেশ করার আগে আমাদের জানা দরকার — মুনাফিক কারা, কখন ও কেন তাদের উদ্ভব ঘটল, এবং কেন কুরআন এই শ্রেণিটিকে এত গুরুত্ব দিয়ে বারবার আলোচনা করেছে।

وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِٱللّٰهِ وَبِٱلْيَوْمِ ٱلْآخِرِ وَمَا هُم بِمُؤْمِنِينَ — সূরা আল-বাকারা, ২:৮

Wa mina n-nāsi man yaqūlu āmannā bi’llāhi wa bi’l-yawmi’l-ākhiri wa mā hum bi-muʾminīn

“আর মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে যারা বলে, ‘আমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছি’, অথচ তারা মুমিন নয়।”

মদিনায় মুনাফিকদের আবির্ভাব

মুনাফিকদের উদ্ভব ঘটেছিল মদিনায়। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ যখন হিজরত করে মদিনায় আশ্রয় পেলেন এবং মদিনাবাসী তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে ইসলামের দাওয়াত রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচারের সুযোগ করে দিলেন, তখন প্রতিষ্ঠিত হলো প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র। একের পর এক যুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে সেই রাষ্ট্রের ভিত ক্রমশ মজবুত হলো। ঠিক এই সময়েই মুনাফিকদের আবির্ভাব।

কারণ ইসলাম তখন শক্তিশালী। ফলে মুসলিম পরিচয় বহন করার মধ্যে জাগতিক সুবিধা তৈরি হলো। একদল লোক সেই সুবিধা নেওয়ার জন্য মুখে দাবি করল যে তারা মুসলিম, অথচ অন্তরে তারা ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করত। মুসলিম সমাজে বসবাস করে তারা মুসলিমদের কাছ থেকে জান ও মালের নিরাপত্তা পেত, মুসলিম পরিবারে বিয়ে-শাদির সুযোগ পেত, এবং উত্তরাধিকারের অধিকার লাভ করত। কেউ যদি প্রকাশ্যে অবিশ্বাস ঘোষণা করত, সে তার বিশ্বাসী আত্মীয়ের উত্তরাধিকারী হতে পারত না; তাই এই জাগতিক লাভগুলো ধরে রাখতে তারা মুসলিম পরিচয় বেছে নিল।

মাক্কী যুগে কেন কোনো মুনাফিক ছিল না

মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে মুনাফিকদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। নবুয়ত লাভের পর মাক্কী যুগের তেরোটি বছরে নিজেকে মুসলিম বলে পরিচয় দেওয়া মানে ছিল নিজের ওপর বিপদ ডেকে আনা। সে সময় মুসলিম পরিচয়ে কোনো সুবিধা ছিল না — বরং ছিল নির্যাতন। যারা এই তেরো বছরে নিজেদের মুসলিম বলে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে, ত্যাগ ও তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, এমনকি দেশত্যাগ করে সর্বস্ব হারাতে হয়েছে। কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায়, জান্নাতের আকাঙ্ক্ষায়, আল্লাহর চেহারার প্রত্যাশায় তাঁরা এসব বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থেকেছেন। যেখানে পরিচয় দেওয়াই বিপদ, সেখানে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে সুবিধা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তাই নিফাকের কোনো ভূমি সেখানে ছিল না।

অবিশ্বাস নয়, বিদ্বেষ

মুনাফিকরা কেবল অবিশ্বাসী ছিল না; তারা ছিল ইসলাম-বিদ্বেষী। তারা মুখে ঈমানের দাবি করত, অথচ অন্তরে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করত, আর গোপনে ইসলামের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করত। বাইরে এক আর ভেতরে আরেক — এই দ্বিমুখিতাই মুনাফিকির মূল স্বরূপ।

কুরআনে মুনাফিকদের জন্য বিশেষ স্থান

সূরা আল-বাকারার সূচনার দিকে তাকালে একটি বিস্ময়কর অনুপাত চোখে পড়ে। মুত্তাকীদের পরিচয়ে যেখানে পাঁচটি আয়াত, অবিশ্বাসীদের বিবরণে যেখানে দুটি আয়াত, সেখানে মুনাফিকদের জন্য বরাদ্দ তেরোটি আয়াত। আর এই আলোচনা কেবল এই সূরাতেই সীমাবদ্ধ নয়। তাফসীর জানার এই যাত্রাপথে আমরা দেখব সূরা আন-নিসা, সূরা আত-তাওবাসহ নানা সূরায় বারবার মুনাফিকদের কথা এসেছে — এমনকি তাদের নামেই সূরা আল-মুনাফিকুন নামে একটি পূর্ণ সূরা রয়েছে।

অতীতের গোষ্ঠী, নাকি চিরকালীন বাস্তবতা

এখানে একটি প্রশ্ন জাগে — অতীতে বিলীন হয়ে যাওয়া একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে সমালোচনা করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কেন কিয়ামত পর্যন্ত পাঠযোগ্য এতগুলো আয়াত নাজিল করলেন? উত্তরটি এখানেই: মুনাফিকি কোনো নির্দিষ্ট যুগে আটকে থাকা ইতিহাস নয়। বর্তমান সময়ে মুসলিমদের অধিকাংশ রাষ্ট্র ইসলামের বিধান দিয়ে পরিচালিত না হলেও, মুসলিম সমাজে মুসলিম পরিচয়ে বসবাসের সুবিধা আজও রয়ে গেছে — আর সেই সুবিধা নিয়ে একদল লোক আজও মুসলিম পরিচয়ের আড়ালে ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ করে যায়। তাই তাদের বৈশিষ্ট্যগুলো চেনা আমাদের জন্য প্রয়োজন। আর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন — নিজেদের অন্তরে নিফাকের ব্যাপারে সতর্ক ও ভীত থাকা।

শিক্ষা

মুনাফিকদের ইতিহাস কেবল অতীতের বিবরণ নয়; এটি একটি আয়না। যে পরিবেশে ইসলাম শক্তিশালী, সেখানেই মুনাফিকির জন্ম হয় — কারণ তখনই মিথ্যা পরিচয়ে জাগতিক সুবিধা মেলে। এই সত্য জানা আমাদের দুইভাবে সহায়তা করে: এক, সমাজে মুনাফিকির বৈশিষ্ট্য চিনে সতর্ক থাকা যায়; আর দুই — যা অধিক গুরুত্বপূর্ণ — নিজের অন্তরকে যাচাই করে নিফাকের সূক্ষ্ম ছায়া থেকে আশ্রয় চাওয়া যায়। কুরআন মুনাফিকদের এত বিস্তারিত পরিচয় দিয়েছে, যেন প্রতিটি প্রজন্ম নিজেকে সেই আয়নায় দেখে নিতে পারে।