‘আমরা তো সংশোধনকারী’ — ফাসাদের প্রকৃত অর্থ
পূর্ববর্তী আলোচনায় আমরা জেনেছি নিফাক কী এবং তা কত প্রকার। এবার আমরা দেখব সূরা আল-বাকারায় মুনাফিকদের যে বৈশিষ্ট্যগুলো বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলো কী কী — আর তার প্রথমটি ফুটে উঠেছে নিচের দুটি আয়াতে, যেগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দ: ফাসাদ।
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلَٰكِن لَّا يَشْعُرُونَ — সূরা আল-বাকারা, ২:১১-১২
Wa idhā qīla lahum lā tufsidū fi’l-ardi qālū innamā nahnu muslihūn. Alā innahum humu’l-mufsidūna wa lākin lā yashʿurūn
“আর যখন তাদের বলা হয়, ‘তোমরা পৃথিবীর বুকে অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ো না’, তখন তারা বলে, ‘আমরা তো কেবল সংশোধনকারী।’ জেনে রাখো, তারাই তো ফাসাদকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।”
নিফাকের দুই প্রকার
নিফাক দুই ধরনের। প্রথমটি আকিদার নিফাক বা বড় নিফাক — যে ব্যক্তি অন্তরে কুফরি লালন করে অথচ বাহ্যিকভাবে নিজেকে মুসলিম দাবি করে, তার আদৌ কোনো ঈমান নেই। কুরআনের ভাষায় সে থাকবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে, কারণ অবিশ্বাসীদের সকল শ্রেণির মধ্যে সে-ই সবচেয়ে নিকৃষ্ট। দ্বিতীয়টি আমলে নিফাক — মুনাফিকদের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য কারো মধ্যে পাওয়া যাওয়া। যেমন মিথ্যা বলা, ওয়াদা ভঙ্গ করা, আমানতের খেয়ানত করা, এবং তর্ক-বিতর্কে সত্য থেকে সরে যাওয়া। এগুলো কারো মধ্যে থাকলে সে চিরজাহান্নামী হয়ে যায় না ঠিকই, কিন্তু তার ব্যাপারে শাস্তির আশঙ্কা থেকে যায়।
এই বৈশিষ্ট্যগুলো আমরা আমাদের সমাজে চলতে গিয়ে বড় বাস্তবভাবেই টের পাই; বলা যায়, ছোটবেলা থেকেই যেন আমরা এগুলোর উপর অভ্যস্ত হয়ে উঠি — একটি শিশু যেদিন প্রথম বলতে শেখে ‘বাবা বাসায় নেই’, সেদিন তাকে বাহবা দেওয়া হয়। তাই আমলে নিফাকের এই আলোচনা মূলত আমাদের নিজেদেরকেই যাচাই করার আহ্বান।
কুরআন বোঝার দুই স্তর: ভাষাগত ও শরয়ী অর্থ
আল কুরআন বুঝতে হলে সর্বদা দুই ধরনের অর্থ পাশাপাশি রাখতে হয় — একটি শব্দের ভাষাগত (লিঙ্গুইস্টিক) অর্থ, আর অন্যটি শরয়ী অর্থ। ভাষাগত অর্থ বোঝার জন্য ভাষাবিদদের বক্তব্য এবং সালাফের বক্তব্য দেখতে হয়। সালাফ বলতে আমরা বুঝি সাহাবী, তাবিঈ ও তাবি-তাবিঈন — এই তিন প্রজন্ম ও তাঁদের অনুসারীদের; বিশেষত এই তিন প্রজন্মের ভাষা-সম্পর্কিত বক্তব্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কেবল ভাষার অর্থই যথেষ্ট নয়; শরয়ী অর্থও দেখতে হয়, কারণ শরীয়ত অনেক সময় কোনো শব্দকে খানিকটা বিশেষায়িত অর্থে গ্রহণ করে।
যেমন ‘সালাত’ শব্দটি। এর ভাষাগত অর্থ ‘দোয়া’। কিন্তু আমরা মুসলিমরা যখন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের কথা বলি, তখন শুধু দোয়ার কথা বলি না, বরং একটি সুনির্দিষ্ট ইবাদতের কথা বলি — যে বিশেষ অর্থটি কেবল ভাষা থেকে পাওয়া যায় না। এই বিশেষ অর্থ পাওয়া যায় কুরআনের অন্যান্য আয়াত, হাদীস এবং সালাফের বক্তব্য থেকে। কাজেই ভাষা ও শরীয়ত — উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের সাহাবী-তাবিঈ-তাবি-তাবিঈনের বক্তব্যে ফিরতে হয়।
ফাসাদের ভাষাগত অর্থ
বাংলায় ‘ফাসাদ’ শব্দটি প্রচলিত, আর তা শুনলে সাধারণত আমাদের মনে ভেসে ওঠে বিশৃঙ্খলা — সামাজিক অস্থিরতা, হত্যাযজ্ঞ ইত্যাদি সংকীর্ণ অর্থ। কেউ হয়তো বলতে পারে, শব্দটি যেহেতু বাংলাতেও হুবহু আছে, তাই অনুবাদেও ‘পৃথিবীর বুকে ফাসাদ করো না’ লেখা যেত। কিন্তু এতে একটা সমস্যা থেকে যায়: শরীয়তে ফাসাদ বলতে যা বোঝায়, তা বাংলা প্রচলিত অর্থের চেয়ে অনেক ব্যাপক। এজন্যই এখানে একটি সাধারণ শব্দ — ‘অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ো না’ — ব্যবহার করা হয়েছে, যেন ফাসাদের ব্যাপক অর্থটি এর মধ্যে চলে আসে।
ভাষাগতভাবে ফাসাদের অর্থ দুইভাবে বলা যায়। প্রথমত, কোনো কিছুর কাম্য বা সুষ্ঠু অবস্থা পরিবর্তিত হওয়া — কোনো বস্তুর যে আদর্শ, ভারসাম্যপূর্ণ বা সুশৃঙ্খল অবস্থা, তা যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন তাকে বলে ফাসাদ। দ্বিতীয়ত, কোনো কিছুর উপকারিতা নষ্ট হয়ে তা ক্ষতিকর হয়ে ওঠা, কিংবা কোনো কিছু নষ্ট বা পচে যাওয়া। খাবারের ক্ষেত্রে বিষয়টি সহজে বোঝা যায়: যে খাবার সুস্বাদু ছিল, সুঘ্রাণযুক্ত ও স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ছিল, তা নষ্ট হয়ে গেলে — স্বাদ-গন্ধ বিকৃত হয়ে খাওয়ার অযোগ্য ও ক্ষতিকর হয়ে উঠলে — বাংলায় আমরা বলি তা ‘পচে’ গেছে। এটিই ভাষাগত ফাসাদ।
সালাফের ব্যাখ্যায় ফাসাদ
ভাষাগত অর্থ জানার পর দেখা দরকার, এই আয়াতে ফাসাদ সম্পর্কে সালাফ কী বলেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমসহ কয়েকজন সাহাবী থেকে বর্ণিত আছে যে ফাসাদ হলো —
هُوَ الْكُفْرُ وَالْمَعْصِيَةُ
Huwa’l-kufru wa’l-maʿsiyah
“তা হলো কুফর ও পাপ (আল্লাহর অবাধ্যতা)।”
এখানে কুফর কেবল অন্তরের অবিশ্বাস নয়; কুফর বিভিন্ন রকমের হতে পারে — অন্তরে বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও মুখে অস্বীকার করা, অহংকারবশত আনুগত্য না করা, কিংবা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা। কাজেই সাহাবীদের এই বক্তব্য অনুসারে সকল কুফরি ও সকল পাপকাজই ফাসাদের অন্তর্ভুক্ত — এ এক ব্যাপক অর্থ, যেখানে বাংলা প্রচলিত ‘সামাজিক বিশৃঙ্খলা’ তো আছেই, আরও বহু কিছু যুক্ত হয়েছে।
সিনিয়র তাবিঈ ও প্রখ্যাত মুফাসসির আবুল আলিয়া রহিমাহুল্লাহ ‘লা তুফসিদু ফিল আরদ’-এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, এর অর্থ ‘পৃথিবীর বুকে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ো না’; তাদের সেই অবাধ্যতাই ছিল তাদের ফাসাদ। কারণ যে ব্যক্তি পৃথিবীর বুকে আল্লাহর অবাধ্যতা করে, কিংবা নিজে পাপ করে বা অন্যকে পাপের আদেশ দেয় ও পাপের দিকে আহ্বান জানায় — উদাহরণস্বরূপ এমন কিছু চালু করে যা মানুষকে পাপে লিপ্ত করে — সে পৃথিবীর বুকে ফাসাদ করল। এরপর তিনি একটি গভীর কথা বলেন —
صَلَاحُ الْأَرْضِ وَالسَّمَاءِ بِالطَّاعَةِ
Salāhu’l-ardi wa’s-samāʾi bi’t-tāʿah
“পৃথিবী ও আকাশের সুষ্ঠু অবস্থা বজায় থাকে আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে।”
এই কথায় একটি ইঙ্গিত আছে: মানুষ প্রকাশ্যে যে ফাসাদ দেখে — প্রাকৃতিক বিপর্যয়, খরা, ফসল ও সম্পদের বিনাশ, সামাজিক বিশৃঙ্খলা — তার মূল কারণ গোপন ফাসাদ, অর্থাৎ আল্লাহর অবাধ্যতা। আবুল আলিয়া যেন বলতে চাইছেন, প্রকৃত ফাসাদ হলো আল্লাহর অবাধ্যতা, কেননা এই অবাধ্যতার কারণেই পৃথিবীতে প্রকাশ্য বিপর্যয় নেমে আসে।
মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ থেকেও এ বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে যে এখানে ফাসাদ অর্থ পাপ কাজ; তারা পাপে লিপ্ত হয়েও দাবি করে যে তারা হিদায়াতের উপর রয়েছে। মুজাহিদের তাফসীর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি ছিলেন ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর সবচেয়ে নিষ্ঠাবান তাফসীর-ছাত্র; তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বারবার তাঁর কাছ থেকে সম্পূর্ণ কুরআনের তাফসীর শিখেছেন, বারবার পড়ে শুনিয়ে যাচাই করেছেন, এবং একই সঙ্গে কিরাআত ও তাফসীর — উভয় শাস্ত্রেই তিনি পারদর্শী ছিলেন। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত বিপুল তাফসীর-রেওয়ায়েতের একটি বড় অংশ দুর্বল সনদে এসেছে; পক্ষান্তরে ইবনে জুরাইজ ও ইবনে আবি নাজীহের সূত্রে মুজাহিদ থেকে বর্ণিত অধিকাংশ রেওয়ায়েত সহীহ। এজন্য ইবনে আব্বাসের তাফসীর যাচাইয়ের একটি নির্ভরযোগ্য উপায় হলো মুজাহিদের তাফসীর দেখা। সব মিলিয়ে বহু মুফাসসিরের বক্তব্যে ফাসাদের তাফসীরে কুফরি ও পাপের উল্লেখ এসেছে।
গোপন পাপও ফাসাদ
এখানে একটি প্রশ্ন ওঠে: কেউ যদি আপাতদৃষ্টিতে কারো কোনো ক্ষতি না করে — যেমন কেউ ঘরের দরজা বন্ধ করে একাকী কোনো পাপ করে, কিংবা অন্তরে অবিশ্বাস নিয়ে মুসলিম সমাজে চলাফেরা করে অথচ কারো ক্ষতি করে না — তবু কি তা ফাসাদ? বাংলা প্রচলিত অর্থে হয়তো আমরা তাকে ফাসাদ বলব না। কিন্তু আবুল আলিয়ার কথায় যে ইঙ্গিত পেলাম, তা থেকে বোঝা যায় এটিও ফাসাদ, দুই কারণে।
প্রথমত, ভাষাগতভাবে ফাসাদ হলো সুষ্ঠু অবস্থা থেকে বিচ্যুতি। একজন বান্দার কাম্য ও সুষ্ঠু অবস্থা হলো আল্লাহর আনুগত্যে থাকা; কাজেই সে যখনই পাপে লিপ্ত হয়, তখন এদিক থেকে তার সেই কাম্য অবস্থা নষ্ট হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, পাপ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ। আল্লাহ কুরআনে জানিয়ে দিয়েছেন —
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ — সূরা আর-রূম, ৩০:৪১
Zahara’l-fasādu fi’l-barri wa’l-bahri bimā kasabat aydi’n-nāsi li-yudhīqahum baʿda’lladhī ʿamilū laʿallahum yarjiʿūn
“মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যেন তিনি তাদের কিছু কর্মের স্বাদ তাদের আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।”
এই আয়াতের সারমর্ম হলো, মানুষের পাপের কারণে জলে-স্থলে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জুলুম-নির্যাতন, রোগ-শোক ও বিপদ-আপদ ছড়িয়ে পড়ে — মানুষের অপকর্মের প্রতিফলের একটি অংশ হিসেবে। তবে এগুলো পাপের পূর্ণ শাস্তি নয়, বরং তার সামান্য একটি স্বাদমাত্র, যেন মানুষ সতর্ক হয়ে পাপ ছেড়ে আল্লাহর আনুগত্যের পথে ফিরে আসে। মানুষের পাপের ভান্ডার বিশাল; আল্লাহ সব পাপের শাস্তি এখনই দিয়ে দিচ্ছেন না, বরং সামান্য একটু স্বাদ দিচ্ছেন — আর এটিও তাঁর রহমত। যারা এতে সতর্ক হয়ে পাপ পরিত্যাগ করবে না, তাদের পূর্ণ প্রতিফল আখিরাতে অপেক্ষা করছে, যা অত্যন্ত কঠোর।
ফাসাদের ব্যাপ্তি
এতক্ষণের আলোচনা থেকে আমরা পেলাম, যাবতীয় কুফরি ও পাপকাজ আরবি ‘ফাসাদ’ শব্দের অন্তর্ভুক্ত — কুফরি, আল্লাহর অবাধ্যতা, মুনাফিকি, জুলুম-নির্যাতন, রাহাজানি, রক্তপাত, মুসলিমদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত, এবং মানুষকে দ্বীনের পথে আসতে বাধা দেওয়া। মানুষকে দ্বীনের পথে আসতে বাধা দেওয়া এক বিরাট ফাসাদ। আর এই ফাসাদ কেবল বাইরের কেউ করে তা নয়; কখনো তা পরিবারের ভেতরেও ঘটে — কোনো কোনো পরিবার সন্তানকে দ্বীনের পথে চলতে দিতে চায় না, বাধা দেয়। বিষয়টি হয়তো আগে বিস্ময়কর মনে হতো, কিন্তু ফাসাদের এই ব্যাপক অর্থ জানার পর বোঝা যায়, দ্বীন পালনে বাধা দেওয়াও ফাসাদেরই একটি রূপ, তা যে-ই করুক।
মুনাফিকদের জবাব
এই ফাসাদ থেকে যখন মুনাফিকদের নিষেধ করা হয়, তখন তারা কী বলে? তারা বলে ‘ইন্নামা নাহনু মুসলিহুন’ — ‘আমরা তো কেবল সংশোধনকারী।’ (এই ‘সংশোধনকারী’ অনুবাদটি পুরোপুরি যথার্থ নয়, তবে এর চেয়ে উপযুক্ত কোনো বাংলা এখনও পাওয়া যায়নি।) অথচ আল্লাহর রায় হলো, ‘জেনে রাখো, তারাই তো ফাসাদকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।’ এখানেই মুনাফিকির আত্মপ্রবঞ্চনার স্বরূপ প্রকাশ পায়: তারা নিজেদের ফাসাদকে সংস্কার বলে চালিয়ে দেয়, আর নিজেরাও তা বুঝতে পারে না।
চারটি তাকিদ: তারাই ফাসাদকারী
মুনাফিকদের এই দাবির জবাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা চারটি ভাষাগত উপকরণ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে তারাই একমাত্র ফাসাদকারী।
أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ — সূরা আল-বাকারা, ২:১২
Alā innahum humu’l-mufsidūn
“জেনে রাখো, তারাই তো ফাসাদকারী।”
প্রথম উপকরণ ‘আলা’ (ألا)। এটি আরবিতে হারফুত-তানবীহ ওয়াত-তাকীদ — অর্থাৎ মনোযোগ আকর্ষণ ও জোর দেওয়ার একটি হারফ। (আরবিতে শব্দ তিন প্রকার: ইসম, অর্থাৎ বিশেষ্য-বিশেষণ; ফিল, অর্থাৎ ক্রিয়া; আর হারফ, যেগুলোকে বাংলায় অব্যয় বলা হয় — যেমন প্রিপজিশন ও কনজাংশন। ‘আলা’ একটি হারফ।) এই শব্দ দিয়ে শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়, আর তার মাধ্যমে পরবর্তী কথার গুরুত্ব বাড়িয়ে দেওয়া হয়। বাংলায় এর সবচেয়ে কাছাকাছি শব্দ ‘শোনো’; যদিও এটি আক্ষরিক অনুবাদ নয়, কারণ ‘আলা’ একটি হারফ আর ‘শোনো’ একটি ক্রিয়া। অনুবাদে অনেকে ‘লক্ষ্য করো’ বা ‘জেনে রাখো’ও ব্যবহার করেছেন, তবে মনোযোগ আকর্ষণে বাংলায় আমরা স্বাভাবিকভাবে বলি ‘শোনো’।
দ্বিতীয় উপকরণ ‘ইন্না’ (إنّ) — অর্থাৎ ‘নিশ্চয়ই’, যা কোনো কথায় জোর বা তাকিদ দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়।
তৃতীয় উপকরণ একটি বাড়তি সর্বনাম ‘হুম’ (هم)। ‘ইন্নাহুমুল মুফসিদুন’ বললেই অর্থ সম্পূর্ণ হতো, কিন্তু তার সঙ্গে আরেকটি ‘হুম’ যোগ করা হয়েছে — ‘ইন্নাহুম হুমুল মুফসিদুন’। এই বাড়তি সর্বনামকে বলা হয় দমীরুল ফাসল (ضمير الفصل); এর বিস্তারিত ব্যাকরণিক আলোচনা অন্য সময়ের জন্য তোলা রইল, তবে এখানে এর ফায়দা হলো কথাটি আরও বেশি জোর পায়।
চতুর্থ উপকরণ নির্দিষ্টতাবাচক ‘আল’ (ال)। ‘মুফসিদুন’ না বলে ‘আল-মুফসিদুন’ বলা হয়েছে। ‘আল’ যুক্ত করার অর্থ — তারাই সেই ফাসাদকারী, যেন সমস্ত ফাসাদকারী তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বাস্তবে মুনাফিকরা ফাসাদকারী, আবার মুনাফিকদের বাইরেও ফাসাদকারী আছে; কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই নির্দিষ্টতাবাচক ‘আল’-এর মাধ্যমে যেন ফাসাদকে মুনাফিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দিলেন।
এই চারটি তাকিদ মিলিয়ে অর্থ দাঁড়ায়: ‘শোনো, নিশ্চয়ই তারাই — কেবল তারাই — ফাসাদকারী।’ এতগুলো জোর দিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাদের ফাসাদ সৃষ্টিকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ থেকেই বোঝা যায় তাদের ফাসাদ কত মারাত্মক পর্যায়ের — অথচ তারা তা টেরও পায় না।
শিক্ষা
এই দুটি আয়াতের মূল শিক্ষা আবর্তিত হয় ‘ফাসাদ’ শব্দটিকে ঘিরে, যা শরীয়তে বাংলা প্রচলিত সংকীর্ণ ‘বিশৃঙ্খলা’ অর্থের চেয়ে অনেক ব্যাপক। এটি যাবতীয় কুফরি ও পাপকে ধারণ করে — এমনকি সেই গোপন পাপকেও, যা আপাতদৃষ্টিতে কারো ক্ষতি করছে বলে মনে হয় না; কারণ বান্দার সুষ্ঠু অবস্থা হলো আল্লাহর আনুগত্য, আর পাপ সেই অবস্থাকে যেমন নষ্ট করে, তেমনি আল্লাহর বিধান অনুসারে তা পৃথিবীতেও বিপর্যয় ডেকে আনে। আর এই আয়াতের সবচেয়ে বড় সতর্কবাণী হলো মুনাফিকের আত্মপ্রবঞ্চনা — ফাসাদকে সংস্কার ভেবে বসা। আল্লাহ এই আত্মপ্রবঞ্চনার জবাব দিয়েছেন চারটি জোরালো তাকিদে — যেন ফাসাদ তাদেরই বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, অথচ তারা তা উপলব্ধিও করে না। এর প্রতিকার নিজের ধারণার মানদণ্ডে নয়, বরং ওহীর মানদণ্ডে সৎভাবে নিজেকে যাচাই করা।